৪ঠা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১৯শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ১৫ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি

রংপুরে ১১ মাসে মাদকবিরোধী অভিযানে গ্রেপ্তার ৩১৫২

admin
প্রকাশিত ডিসেম্বর ২৭, ২০২৫
রংপুরে ১১ মাসে মাদকবিরোধী অভিযানে গ্রেপ্তার ৩১৫২

Manual3 Ad Code

লোকমান ফারুক, রংপুর

ভোরের কুয়াশা তখনো পুরোপুরি কাটেনি। সীমান্তঘেঁষা জনপদের কাঁচা রাস্তা ধরে হঠাৎ থেমে যায় একটি সরকারি গাড়ি। চারপাশে নিস্তব্ধতা—শুধু দূরে কুকুরের ডাক আর শীতের বাতাসে কাঁপতে থাকা গাছের পাতা।

কয়েক মিনিটের মধ্যেই সেই নীরবতা ভেঙে পড়ে। শুরু হয় আরেকটি অভিযান। এই দৃশ্য রংপুর বিভাগের আট জেলার জন্য আর নতুন নয়—গত সাড়ে ১১ মাস ধরে এমন দৃশ্য প্রায় নিয়মিত।

এই নীরব যুদ্ধের হিসাব কষলে চমকে উঠতে হয়। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে গত ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত রংপুর বিভাগে মাদকবিরোধী অভিযানের সংখ্যা ৯ হাজার ৯১০টি।

Manual6 Ad Code

এসব অভিযানে দায়ের হয়েছে ৩ হাজার ২৭টি মামলা, আর গ্রেপ্তার হয়েছে ৩ হাজার ১৫২ জন—সংখ্যাগুলো কেবল পরিসংখ্যান নয়, বরং একটি অঞ্চলের ভেতরে চলমান অদৃশ্য সংকটের দলিল।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের নথিপত্র বলছে, এই সাড়ে ১১ মাসে উদ্ধার করা হয়েছে প্রায় ১০ হাজার ৬০০ কেজি গাঁজা, সাড়ে চার হাজার বোতল ফেনসিডিল, ৫০০ গ্রাম হেরোইন এবং সাড়ে পাঁচ হাজার পিস ইয়াবা ট্যাবলেট।

দেশি-বিদেশি এসব মাদক যেন এক অদৃশ্য স্রোতের মতো সীমান্ত পেরিয়ে সমাজের শিরায় ঢুকে পড়ছিল।

অভিযান শুধু মাদকেই সীমাবদ্ধ ছিল না। জব্দ করা হয়েছে ৮ লাখ টাকা নগদ অর্থ, যা মাদক বেচাকেনার নীরব সাক্ষী। সঙ্গে রয়েছে ১৮টি মোটরসাইকেল, ৩টি মাইক্রোবাস, ৩টি সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ১০টি ইজিবাইক এবং ৬৪টি মোবাইল ফোন—যানবাহন ও যোগাযোগের এই সরঞ্জামগুলোই ছিল কারবারিদের চলমান শিরদাঁড়া।

একজন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বলছিলেন, “এই ফোনগুলোই ছিল তাদের নীরব ভাষা, আর যানবাহনগুলো ছিল চলমান অপরাধের বাহক।” কথাগুলো শুনলে প্রশ্ন জাগে—এতদিন ধরে এই অবকাঠামো কীভাবে চোখের আড়ালে থাকলো?

রংপুর বিভাগ মাদক কারবারিদের কাছে কেন এত গুরুত্বপূর্ণ—এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে ভূগোলের ভাঁজে। সীমান্তবর্তী অঞ্চল হওয়ায় এই বিভাগ দীর্ঘদিন ধরেই মাদক পরিবহনের একটি সুবিধাজনক রুট।

Manual4 Ad Code

কর্মকর্তাদের ভাষায়, “রংপুর কেবল একটি বিভাগ নয়, এটি কারবারিদের জন্য একটি করিডোর।”

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, রংপুর বিভাগ কার্যালয়ের অতিরিক্ত পরিচালক মাসুদ হোসেন বলেন, “বিভাগজুড়ে প্রতিদিন নিয়মিতভাবে অভিযান চলছে।মা

দক সেবনকারী, কারবারি, পরিবহনকারী ও সহযোগী—কাউকেই ছাড় দেওয়া হচ্ছে না।” তার কণ্ঠে দৃঢ়তা, কিন্তু বাস্তবতা আরও জটিল।

তিনি আরও বলেন, “মাদক শুধু নেশা নয়, এটি সমাজের ভেতরে ধীরে ধীরে পচন ধরায়। তরুণ সমাজ বিপথগামী হচ্ছে, ভাঙছে পরিবার, ক্ষয়ে যাচ্ছে সামাজিক বন্ধন।” এই বক্তব্যে প্রশাসনিক ভাষার আড়ালে একটি নৈতিক আর্তি স্পষ্ট।

তবু প্রশ্ন থেকেই যায়—হাজারো অভিযানের পরও কেন মাদক পুরোপুরি থামে না? এত গ্রেপ্তার, এত জব্দের পরও কেন নতুন করে কারবারিরা গজিয়ে ওঠে? এই যুদ্ধ কি কেবল উপসর্গের বিরুদ্ধে, নাকি মূল রোগ এখনো অক্ষত?

Manual8 Ad Code

রংপুরে মাদকবিরোধী এই অভিযানগুলো যেন একদিকে আশার গল্প, অন্যদিকে অস্বস্তির আয়না। প্রতিটি গ্রেপ্তার যেমন আইনের জয়, তেমনি প্রতিটি উদ্ধার হওয়া চালান মনে করিয়ে দেয়—সমস্যার শিকড় কতটা গভীরে।

শীতের কুয়াশার মতোই মাদক এখানে নিঃশব্দে আসে, নিঃশব্দেই ছড়িয়ে পড়ে। আর রাষ্ট্রযন্ত্র প্রতিদিন সেই কুয়াশা ভেদ করে আলো জ্বালানোর চেষ্টা করছে।

Manual5 Ad Code

প্রশ্ন হলো—এই আলো কি একদিন পুরো অন্ধকার দূর করতে পারবে, নাকি যুদ্ধটি আরও দীর্ঘ হতে চলেছে?