২৫শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১১ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ১০ই মহর্‌রম, ১৪৪৮ হিজরি

শ্রম পরিদর্শন না প্রহসন? ঈদের আগে হোটেল শ্রমিকদের বোনাস সংকটের ভেতরের গল্প

Editor
প্রকাশিত মার্চ ২, ২০২৬
শ্রম পরিদর্শন না প্রহসন? ঈদের আগে হোটেল শ্রমিকদের বোনাস সংকটের ভেতরের গল্প

Manual6 Ad Code

শ্রম পরিদর্শন না প্রহসন? ঈদের আগে হোটেল শ্রমিকদের বোনাস সংকটের ভেতরের গল্প

লোকমান ফারুক, রংপুরঃ ভোর ছয়টা। রংপুর শহরের আকাশ তখনও ধূসর। অ্যালার্ম বাজার আগেই ঘুম ভাঙে বকুলের। তার দিন শুরু হয় দৌড়ে, শেষ হয় দাঁড়িয়ে। রংপুরের একটি বড় রেস্তোরাঁয় ওয়েটার। ৯ থেকে ১০ ঘণ্টা কাজ। কখনো কখনো তারও বেশি। ওভারটাইমের হিসাব নেই। “ব্যবসা খারাপ”—এই এক বাক্যে সব দাবি থেমে যায়। দৈনিক মজুরি থেকে হাতখরচ বাদ দিয়ে যা থাকে, তা পাঠায় বাড়িতে। এবার মা বলেছে—”বোন-দুলাভাই আসবে ঈদে। ভালো-মন্দ করবি।”বকুল হিসাব মিলিয়ে দেখে—বেতন দিয়ে কোনোরকমে চলে। ভরসা একটাই—ঈদ বোনাস।
কিন্তু সেই বোনাসই এখন অনিশ্চয়তার আরেক নাম।

বাংলাদেশ শ্রম বিধিমালা ১১১(৫) উপধারা বলছে—উৎসব বোনাস শ্রমিকের সংরক্ষিত অধিকার।
আর ৩৫১ ধারায় পরিষ্কারভাবে উল্লেখ আছে, পরিদর্শকগণ যেকোনো প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ, রেকর্ড তলব ও পরীক্ষা করতে পারবেন; আইনের উদ্দেশ্য পূরণে প্রয়োজনীয় ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন। কাগজে আইন দৃঢ়।
মাঠে আইন নরম।

রংপুর, ঢাকা, রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোর, সিরাজগঞ্জ, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁ, বগুড়া—দেশের জেলা শহরগুলোর হোটেল-রেস্তোরাঁ শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে যে চিত্র উঠে আসে, তা একরকম—পূর্ণ বোনাস বিরল। অর্ধেক বোনাস সাধারণ। আর একেবারেই না পাওয়া—অস্বাভাবিক নয়। ঢাকার একটি ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকায় কর্মরত এক ওয়েটার বলেন,”পরিদর্শক আসার আগেই খবর আসে। ভুয়া রেজিস্টারে ভুয়া স্বাক্ষর দেখিয়ে পরিদর্শন শেষ করা হয়—সব ঠিক আছে।” রাজশাহীর এক রাঁধুনি বলেন,”বোনাস চাইলে বলে—কাজ করতে চাইলে চুপ থাক।”

একজন সাবেক শ্রম পরিদর্শক, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, বলেন—”সবাই দুর্নীতিগ্রস্ত নয়। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে আগাম সমঝোতা হয়। আগাম ফোন যায়। রেজিস্টার প্রস্তুত থাকে। শ্রমিকদের ব্রিফ করা হয়।” তার ভাষায়, “রুটিন ভিজিট” অনেক সময় হয়ে ওঠে “রুটিন মীমাংসা”। অভিযোগ অনুযায়ী, নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলে বড় রেস্তোরাঁ মালিকদের সঙ্গে কিছু পরিদর্শকের ‘সমঝোতা সম্পর্ক’ গড়ে উঠেছে। মাসিক সুবিধা বা বিশেষ উপলক্ষে লেনদেনের বিনিময়ে অভিযোগ নরম হয়, রিপোর্ট মসৃণ হয়,আর ফাইল বন্ধ থাকে।

এইচক্রে মালিকপক্ষ লাভবান—কারণ, বোনাস না দিয়েও আইনি ঝুঁকি এড়ায়। অসাধু পরিদর্শক—কারণ, প্রয়োগের ক্ষমতা হয়ে ওঠে ব্যক্তিগত সুবিধার হাতিয়ার। নিষ্ক্রিয় ট্রেড ইউনিয়ন নেতৃত্বের একটি অংশ—যারা প্রতিবাদের চেয়ে ‘মধ্যস্থতা’কে নিরাপদ পথ মনে করেন। আর ক্ষতিগ্রস্ত? বকুলের মতো হাজারো শ্রমিক—যাদের কণ্ঠস্বর চাপা পড়ে ‘ব্যবসা খারাপ’ যুক্তির নিচে।

১৯৮৪ সালে সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ-এর আমলে উৎসব ভাতা আনুষ্ঠানিক রূপ পায়। প্রথমে অর্ধেক, পরে পূর্ণ বোনাস। একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ধীরে ধীরে সামাজিক প্রত্যাশায় পরিণত হয়। তারপর শ্রমিক অধিকারের অংশ হয়। কিন্তু চার দশক পরও বেসরকারি খাতের একটি বড় অংশে সেটি রয়ে গেছে ‘অনুগ্রহ’—অধিকার নয়। একজন শ্রম বিশ্লেষক বলেন,”হোটেল-রেস্তোরাঁ খাতটি অত্যন্ত অনানুষ্ঠানিক। নিয়ম আছে, কিন্তু প্রয়োগ দুর্বল। শ্রমিকরা সংগঠিত নয়, আর সংগঠিত হলেও ভীত।”

Manual2 Ad Code

রাজশাহীর একজন ট্রেড ইউনিয়ন কর্মী স্বীকার করেন,
“সব জায়গায় আমরা শক্ত অবস্থানে নেই। অনেক মালিক প্রভাবশালী। অভিযোগ করলে চাকরি যায়।”
একটি সূত্র জানায়, কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের মালিকেরা অনানুষ্ঠানিকভাবে সিদ্ধান্ত নেন—”একসাথে কম দিলে কেউ আলাদা করে দাবি তুলতে পারবে না।” এই কৌশলটি পরিচিত—সমষ্টিগত নিম্নমান বজায় রাখা।
ফলাফল—শ্রমিকের বিকল্প কমে যায়। ভয় বেড়ে যায়।
নীরবতা দীর্ঘ হয়।

Manual2 Ad Code

দুপুরের ব্যস্ততায় রেস্তোরাঁয় দাঁড়িয়ে দেখা যায়—বকুলের হাতে ট্রে স্থির। অতিথিদের সামনে সে হাসে।
কিন্তু বোনাসের প্রসঙ্গে তার কণ্ঠ নরম হয়ে যায়।
“বোনাস না পেলে বাড়ি যেতে পারব না। গেলে টাকা লাগবে। না গেলে মা কাঁদবে।” এই একটি বাক্যেই শ্রম আইনের ব্যর্থতা ধরা পড়ে।

রংপুরের একজন রেস্তোরাঁ মালিক বলেন, “ব্যবসা আগের মতো নেই। খরচ বেড়েছে। সবাইকে ফুল বোনাস দেওয়া সম্ভব নয়।” প্রশ্ন—তাহলে আইন? উত্তর—”সবাই কি সব আইন মানে? “উত্তরটি ছোট। প্রশ্নটি বড়।

Manual7 Ad Code

প্রশ্ন থেকে যায়, আইন যদি প্রয়োগহীন হয়; তবে সেটি কি শুধু ঘোষণাপত্র? পরিদর্শক যদি রক্ষকের বদলে সমঝোতার সেতু হন, তবে শ্রমিকের আস্থা কোথায় যাবে? ট্রেড ইউনিয়ন যদি দ্বিধাগ্রস্ত হয়, তবে সংগ্রামের ভাষা কে লিখবে? ঈদের চাঁদ উঠবে। শহরের বড় রেস্তোরাঁয় কাবাবের ধোঁয়া উঠবে, সেমাইয়ের বাটি ভরবে। অতিথিদের টেবিলে উৎসব। কিন্তু রান্নাঘরের পেছনে, থালাবাসনের শব্দের ভেতর, বকুলের মতো শ্রমিকদের মনে প্রশ্নই ঘুরবে—”আমার অধিকার কি আমারই?”
যতদিন না পরিদর্শনের খাতা বাস্তবের সঙ্গে মেলে,
যতদিন না বোনাস অনুগ্রহ নয়, প্রাপ্য হিসেবে নিশ্চিত হয়। ততদিন ঈদের আনন্দের নিচে থেকে যাবে এক অদৃশ্য ফাটল। সেই ফাটলই এই সময়ের শ্রম বাস্তবতার আয়না।

Manual4 Ad Code