২৫শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১১ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ১০ই মহর্‌রম, ১৪৪৮ হিজরি

একটি প্রজ্ঞাপন, বহু প্রত্যাশা: ঈদ বোনাসের অন্তরালের গল্প

Editor
প্রকাশিত ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০২৬
একটি প্রজ্ঞাপন, বহু প্রত্যাশা: ঈদ বোনাসের অন্তরালের গল্প

Manual8 Ad Code

একটি প্রজ্ঞাপন, বহু প্রত্যাশা: ঈদ বোনাসের অন্তরালের গল্প

লোকমান ফারুক, রংপুরঃ ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ফোটেনি। রংপুর শহরের এক সরু গলিতে খবরের কাগজ ঠেলে দেওয়া হকার বিলের খাতায় নীরবে একটি নতুন লাইন টেনে দেয় “উৎসব ভাতা”। মোড়ের চায়ের দোকানে কর্মচারীটি মাসের শেষে হিসাব চাইতে গিয়ে একটু থামে, তারপর বলে স্যার, ঈদের আগে বোনাসটা…”। রিকশার প্যাডেলে চাপ বাড়ায় চালক, ভাড়া দেওয়ার সময় যাত্রীকে মৃদু হাসি দিয়ে মনে করিয়ে দেয়”স্যার সামনে ঈদ”।

আজ ঈদ বোনাস যেন উৎসবের অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ। কিন্তু এই দাবির পেছনের ইতিহাস ততটা পুরোনো নয়, যতটা আমরা ধরে নিই। স্বাধীনতার পর দেড় দশক পেরিয়ে ১৯৮৪ সালে প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে উৎসব ভাতার সূচনা হয়। সিদ্ধান্তটি আসে সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ-এর সময়ে এক প্রশাসনিক প্রজ্ঞাপন, যা ধীরে ধীরে রূপ নেয় সামাজিক রীতিতে, তারপর অধিকার-সচেতনতার দাবিতে।

মূল্যস্ফীতির ছায়া, সিদ্ধান্তের আলো

একজন জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ফিরোজ (ছদ্মনাম) বলেছেন, “এটি ছিল রাজনৈতিকও, অর্থনৈতিকও। মূল্যস্ফীতি বাড়ছিল। বেতন কাঠামো বাস্তবতার সঙ্গে তাল রাখতে পারছিল না। বোনাস ছিল একধরনের ‘কুশন’।” সরকারের এক সাবেক আমলা যোগ করেন, “শুরুতে ছিল হাফ বোনাস মূল বেতনের অর্ধেক। পরে ফুল বোনাস। কিন্তু ভেতরে ভেতরে ছিল শ্রেণিভেদ।”

নথি ঘেঁটে দেখা যায়, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরা যে বছর শ্রান্তি বিনোদন ভাতা পেতেন, সে বছরও বোনাস পেতেন। কিন্তু প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে নিয়ম আলাদা ছিল একটি পেলে অন্যটি নয়।প্রশাসনিক ভাষায় এটি ছিল ‘সামঞ্জস্য’, কর্মচারীদের ভাষায় ‘বৈষম্য’। আজ সেই বিভাজন নেই। তিন বছর পরপর শ্রান্তি বিনোদন ভাতা, ধারাবাহিকভাবে উৎসব ভাতা সব শ্রেণির জন্য একই নিয়ম। কাগজে-কলমে সমতা প্রতিষ্ঠিত।

ধর্ম, অধিকার ও হিসাবের অঙ্ক

প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা ধর্মীয় উৎসবে বোনাস পান। মুসলমানরা দুই ঈদে দুটি বোনাস। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা দুর্গোৎসবে, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানরা তাঁদের প্রধান উৎসবে দুটি মূল বেতনের সমপরিমাণ। রাষ্ট্র এখানে সমতা দেখাতে চেয়েছে কেউ বেশি, কেউ কম নয়; বরং উৎসবের সংখ্যার সমতা। কিন্তু শিল্প প্রতিষ্ঠানের গল্পটি ভিন্ন।

Manual7 Ad Code

একজন প্রবীণ ট্রেড ইউনিয়ন নেতা বললেন, “আগে মালিকেরা শ্রমিকদের শাড়ি-লুঙ্গি বা পাঞ্জাবি দিতেন, অনেক সময় যাকাতের টাকা থেকে। পরে আইন হলো। এখন নগদ দিতে হয়।” তিনি যে আইনের কথা বলেছেন, সেটি বাংলাদেশ শ্রম বিধিমালা ধারা ১১১(৫)। সেখানে স্পষ্ট: একটানা এক বছর চাকরি পূর্ণ করলে বছরে দুটি উৎসব ভাতা বাধ্যতামূলক। কিন্তু কাগজের আইন আর কারখানার বাস্তবতা এক নয়। শ্রমিকদের অভিযোগ অনেক মালিক ‘মূল মজুরি’ আর ‘সাকুল্য মজুরি’র ফারাক দেখিয়ে বোনাস কমিয়ে দেয়। মূল মজুরি যদি হয় ৮ হাজার, সাকুল্য ১২ হাজার তাহলে কোন অঙ্কে বোনাস? আইন বলে ‘মূল মজুরি’। কিন্তু শ্রমিকের সংসার চলে সাকুল্য দিয়ে। পোশাক কারখানার একজন শ্রমিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমরা জানি না কোনটা ঠিক। সই করি, টাকা নিই। পরে বুঝি কম পেয়েছি।”

কারা লাভবান, কারা রক্ষাকবচ?

অভিযোগের আঙুল ঘুরে যায় দুই দিকে এক শ্রেণির ট্রেড ইউনিয়ন নেতা এবং শ্রম পরিদর্শন অধিদপ্তরের কিছু কর্মকর্তার দিকে। শ্রমিকদের ভাষায়, “নজরদারি ঢিলেঢালা।” শ্রম পরিদর্শন অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা (অফ দ্য রেকর্ড) স্বীকার করেন, “জনবল কম, প্রতিষ্ঠান বেশি। সব জায়গায় নজরদারি সম্ভব হয় না।” কিন্তু শ্রমিকদের প্রশ্ন “তাহলে আইন কাদের জন্য?”
এই প্রশ্নে নৈতিক দ্বন্দ্ব স্পষ্ট। রাষ্ট্র বোনাসকে অধিকার করেছে; সমাজ সেটিকে রীতি বানিয়েছে; আর বাজার সেটিকে হিসাবের খাতায় টেনেছে।

বোনাসের সমাজতত্ত্ব

Manual4 Ad Code

ঈদ বোনাস এখন শুধু বেতনভুক্ত কর্মচারীর বিষয় নয়। এটি সামাজিক প্রত্যাশা। বাড়ির কাজের সহায়িকা, রিকশাচালক, কাগজওয়ালা—সবাই উৎসবের আগে ‘অতিরিক্ত’ আশা করেন। অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি একধরনের ‘ইনফর্মাল রিডিস্ট্রিবিউশন’। উৎসবের আগে সাময়িক আয় বৃদ্ধি, যা নিম্নআয়ের মানুষের হাতে নগদ প্রবাহ বাড়ায়। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—এই প্রবাহ কি কাঠামোগত বৈষম্য কমায়, নাকি কেবল উৎসবের

আলোর মতো সাময়িক ঝলক?

১৯৮৪ সালের সেই সিদ্ধান্ত হয়তো ছিল প্রশাসনিক প্রজ্ঞাপন। কিন্তু আজ তা সামাজিক চুক্তি। রাষ্ট্র, মালিক, শ্রমিকতিন পক্ষের অদৃশ্য সমঝোতা।
ভোরের সেই হকার আবার দরজার নিচ দিয়ে কাগজ ঢুকিয়ে দেয়। বিলের মেমোতে ‘উৎসব ভাতা’ লেখা লাইনটি এখন আর বাড়তি নয় এটি প্রত্যাশার নাম।
ঈদ বোনাস এসেছে মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে, প্রশাসনিক প্রয়োজন থেকে, রাজনৈতিক কৌশল থেকে। কিন্তু টিকে আছে মানুষের আশায়।

Manual8 Ad Code

প্রশ্ন কেবল একটাই আইনের অক্ষর কি সবার ঘরে সমান আলো পৌঁছায়? নাকি কোথাও কোথাও সেই আলো হিসাবের খাতায় আটকে যায়?
ঈদ আসে, ঈদ যায়। বোনাসের অঙ্ক বদলায়। কিন্তু ন্যায়ের প্রশ্নটি থেকে যায়—চিরকালীন, অমোচনীয়।

Manual3 Ad Code