৭ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২২শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ১৮ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি

কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে নওগাঁর ঐতিহ্যবাহী খেঁজুর রস

admin
প্রকাশিত ডিসেম্বর ২৭, ২০১৯
কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে নওগাঁর ঐতিহ্যবাহী খেঁজুর রস

Manual6 Ad Code

নাইম উদ্দিন,নওগাঁ জেলা প্রতিনিধি :

কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে নওগাঁর ঐতিহ্যবাহী খেঁজুর রস পৃথিবী এক আজব জায়গা। এখানে চলছে অতীত-বর্তমানের রেষারেষি। এই রেষারেষির যাতাকলে পড়ে অনেক কিছুর সৃষ্টি হচ্ছে আবার অনেক কিছু হারিয়ে যাচ্ছে। আমাদের বাংলাদেশ ষড়ঋতুর দেশ। বছরের একেক সময় একেক রূপ ধারণ করে সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা, আমাদের এই বাংলাদেশ।

 

এরই মধ্যে সকালে ঘাসের ডগায় শিশির ভেজা মুক্তকণা জানান দিচ্ছে শীতের। বছরের এ সময়টায় আবছা কুয়াশার চাদরে ঢেকে নিজেকে আড়াল করে আমাদের মাতৃভূমি। শীতে ফসলের ক্ষেতে নানান ধরণের শাক-সবজির জুড়ি মেলে। বছরের এই সময়টায় মেলে মাটির হাড়িতে বাঁধিয়ে রাখা মিষ্টি খেঁজুর রস। কিন্তু কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামবাংলার চিরচেনা খেঁজুর রস।

 

নওগাঁর পোরশায় শীতের সঙ্গে রয়েছে খেঁজুর রসের আত্মিক যোগাযোগ। তবে সেটিও এখন হারিয়ে যেতে বসেছে। একটা সময় শীত মৌসুমের শুরুতেই গ্রামগঞ্জের মনুষেরা খেঁজুর গাছ ছিলানো (রস বের করার জন্য কাটা পদ্ধতি) নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়তেন। কে কার আগে রস সংগ্রহ করতে পারে, এ নিয়ে প্রতিযোগিতার শেষ থাকতো না। এ সময়টায় গাছিদের (খেঁজুর রস সংগ্রহকারী) আনন্দের সীমা থাকত না। শীতের ভোরে খেঁজুর রস সংগ্রহের জন্য গাছিরা মহাব্যস্ত হয়ে পড়ত। কোমরে রশি বেঁধে গাছে ঝুলে ঝুলে রস সংগ্রহ করতে দেখা যেত তাদের।

 

গ্রামে গ্রামে খেঁজুর রস দিয়ে নতুন আমন ধানের পিঠা, ভাপা, পুলি ও পায়েশ তৈরির রীতিমতো ধুম পড়ে যেত। তাছাড়া খেজুরের গুড় দিয়ে তৈরি মুড়ির মোয়া, চিরার মোয়া, রসে ভিজিয়ে মুড়ি খাওয়া প্রায় সর্বস্তরের মানুষের কাছে প্রতিদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়ে উঠতো। শীত যতো বাড়তে থাকতো খেঁজুর রসও ততো মিষ্টি হতো।

 

শীতের সকাল মানেই গ্রামের অলি-গলিতে চলতো রস মুড়ির আড্ডা। তবে এসব এখন আর দেখা যায়না। তবে ভাচুঁয়াল সব কারসাজির যুগে রস-মুড়ি খাওয়ার সকালের সেই পারিবারিক আড্ডা এখন আর আর দেখা যায় না।

 

Manual6 Ad Code

অতিরিক্ত বাড়ি-ঘর নির্মাণ আর নির্বিচারে গাছ কাটার ফলে নওগাঁওয়ের পল্লী-গ্রামে খেঁজুর গাছের সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে কমে গেছে। যে হারে গাছ কাটা হয়েছে সে হারে রোপন করা হয়নি।

 

এছাড়া যেসব গাছ আছে, সেগুলোও সঠিকভাবে পরিচর্যা না করা এবং গাছ ছিলানোর পদ্ধতিগত ভুলের কারণে প্রতিবছর অসংখ্য খেঁজুর গাছ মারা যাচ্ছে। প্রতি বছরের ন্যায় এ বছরও পেশাদার গাছির সংকট। তারপরেও উপজেলার কয়েকটি এলাকায় ইতোমধ্যে শখের বশত গাছিরা নামমাত্র রস সংগ্রহ করছেন।

 

Manual1 Ad Code

উপজেলার কাদিপুর গ্রামের গাছি আবু বলেন, ‘শীত মৌসুম এলে গাছ ছাঁটাই করে, রস বিক্রির টাকায় ভালোভাবে সংসার চালাতে পারতাম। আগে প্রতি বছর শীত মৌসুমে নিজের গাছ ছাড়াও নির্ধারিত অর্থ বা গুড় দেয়ার চুক্তিতে অন্যের ১০-১৫ টি গাছ ছিলতাম। কিন্তু এখন গাছ মরে যাওয়া এবং গাছ বিক্রি করার কারণে মাত্র একটি গাছ কাটি। গাছ কম থাকায় গ্রামবাসী খেঁজুরের রস থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।’

 

গ্রামের কালাম বাবু নামে বলেন, ‘এক সময় আমাদের এলাকায় প্রায় প্রতিটি বাড়িতে, জমির আইলে, রাস্তার পাশে, পতিত জমিতে সারি সারি খেঁজুর গাছ ছিলো। বর্তমানে খেঁজুর গাছ মরে যাওয়া এবং বিক্রি করার কারণে খেঁজুর গাছ নেই বললেই চলে।’

Manual2 Ad Code

 

এমনভাবে চলতে হয়তো কয়েক বছর বাদেই খেঁজুর রসের গ্রাম বাংলার এ ঐতিহ্য হারিয়ে যাবে। আগামী প্রজন্মের কাছে খেঁজুর রস রূপকথার গল্পের মতো মনে হবে। কোনো এক শীতে চা কিংবা কফির পেয়ালায় চুমুক দিয়ে অনেকে হয়তো খেঁজুর রসের গল্পে মাতবে।

Manual1 Ad Code