১৮ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৫ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ১লা রমজান, ১৪৪৭ হিজরি

চলে গেলেন সংবাদযোদ্ধা, রয়ে গেল রংপুরের ইতিহাস

admin
প্রকাশিত জানুয়ারি ৭, ২০২৬
চলে গেলেন সংবাদযোদ্ধা, রয়ে গেল রংপুরের ইতিহাস

Manual1 Ad Code

লোকমান ফারুক, রংপুর

ভোর তখনো পুরোপুরি আলো হয়নি। জানালার বাইরে রংপুর শহর ঘুম ভাঙার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ঠিক সেই সময় ভোর ৪টার একটু আগে একটি দীর্ঘ জীবনের শব্দহীন পরিসমাপ্তি ঘটে। হাসপাতালের নিস্তব্ধ করিডরে থেমে যায় হৃদস্পন্দন। চলে যান আব্দুস সাহেদ মন্টু রংপুরের সাংবাদিকতার জীবন্ত দলিল, সময়ের সাক্ষী।
(ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)

বার্ধক্যজনিত কারণে নগরীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন রংপুর প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আব্দুস সাহেদ মন্টু। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮১ বছর। রেখে গেছেন স্ত্রী, দুই সন্তান এবং অসংখ্য সহকর্মী, শিষ্য ও গুণগ্রাহী যাদের অনেকের সাংবাদিক জীবনের শুরু হয়েছিল তার হাত ধরেই।

বিকেলে, শহরের আকাশ যখন হালকা নীল থেকে ধূসর হয়ে আসছে, ফায়ার সার্ভিস সিভিল ডিফেন্স জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয় তার জানাজা। বাদ আছরের নামাজ শেষে বড় নূরপুর কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয় তাকে।

জানাজার কাতারে ছিলেন সাংবাদিক, রাজনীতিক, সংস্কৃতিকর্মী, পেশাজীবী কিন্তু সবার পরিচয় এক জায়গায় এসে মিশে যায়: তিনি ছিলেন সবার মন্টু ভাই।

এর আগে দুপুরে, রংপুর প্রেসক্লাব প্রাঙ্গণে তার মরদেহে একে একে শ্রদ্ধা জানান রংপুর প্রেসক্লাব, আরপিজেইউ, রংপুর সম্মিলিত সাংবাদিক সমাজ, বাংলাদেশ ফটো জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন, টেলিভিশন ক্যামেরা জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনসহ বিভিন্ন সংগঠন। ফুলে ফুলে ঢেকে যায় সেই শরীর, যে শরীর একসময় দিনের পর দিন খবরের পেছনে ছুটেছে নিঃশব্দে, নিরলসভাবে।

Manual5 Ad Code

আব্দুস সাহেদ মন্টুর জন্ম ১৯৪৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর। জন্ম রংপুর শহরের জি.এল রায় রোড এলাকায়, মন্হনায়। তবে শেকড় প্রোথিত বদরগঞ্জ উপজেলার রাধানগর ইউনিয়নের মাদারগঞ্জে।

Manual7 Ad Code

বাবা আব্দুস সামাদ, মা শহিদা খাতুন সাধারণ এক পরিবারের সন্তান হয়েও তিনি হয়ে উঠেছিলেন অঞ্চলের বিবেক।

শিক্ষাজীবন শুরু আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে। পরে কৈলাশ রঞ্জন হাই স্কুল থেকে ১৯৬৪ সালে ম্যাট্রিকুলেশন। এরপর রংপুর সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি ও গ্র্যাজুয়েশন। কিন্তু বইয়ের পাতার পাশাপাশি তাকে টানত অন্য এক জগৎ—খবরের জগৎ।

স্কুল জীবনেই সাংবাদিকতার প্রতি তার ঝোঁক তৈরি হয়। প্রয়াত সাংবাদিক আব্দুল মজিদের অনুপ্রেরণায়, ম্যাট্রিকুলেশন পাসের আগেই ১৯৬৪ সালে দৈনিক আজাদী দিয়ে শুরু হয় তার সাংবাদিকতার পথচলা।

এরপর দৈনিক পয়গাম, তারপর পিপিআই। ধীরে ধীরে তিনি হয়ে ওঠেন নির্ভরযোগ্য নাম। ১৯৭৬ সালে ইংরেজি দৈনিক বাংলাদেশ টাইমস-এর রংপুর প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব নেন। প্রায় দুই দশক পর ১৯৯৫ সালে যোগ দেন দি ইন্ডিপেন্ডেন্ট-এ। কিন্তু তার সাংবাদিকতার বিস্তার থেমে থাকেনি দেশের গণ্ডিতে।

Manual8 Ad Code

১৯৮৬ সালে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সে রংপুর প্রতিনিধি হিসেবে যুক্ত হন তিনি। ২০১৪ সাল পর্যন্ত তিন দশকের কাছাকাছি সময় ধরে রংপুর অঞ্চলের রাজনীতি, আন্দোলন, মাটি ও মানুষের গল্প বিশ্বমাধ্যমে তুলে ধরেন। একই সঙ্গে ১৯৮৬ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত কাজ করেন বিবিসি বাংলার প্রতিনিধি হিসেবে।

মফস্বল থেকে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে সত্য তুলে ধরার যে কঠিন পথ—সেই পথের নীরব যাত্রী ছিলেন আব্দুস সাহেদ মন্টু। তার প্রতিবেদনে ছিল না অতিরঞ্জন, ছিল না শোরগোল। ছিল নির্ভুলতা, ছিল দায়িত্ববোধ।
দীর্ঘ ছয় দশকের সাংবাদিকতা জীবনে তিনি ছিলেন রংপুর প্রেসক্লাবের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। রংপুর সম্মিলিত সাংবাদিক সমাজের আহ্বায়ক হিসেবে তিনি হয়ে উঠেছিলেন এই অঞ্চলের সাংবাদিকদের পরম অভিভাবক। মতভেদে নয়, মূল্যবোধে তিনি সবাইকে এক সুতোয় গেঁথে রেখেছিলেন।

সাংবাদিকতার বাইরেও তিনি ছিলেন সমাজসেবক। রংপুর পাবলিক লাইব্রেরির আজীবন সদস্য হিসেবে জ্ঞানের আলো ছড়ানোর কাজে যুক্ত ছিলেন নীরবে।
তার অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বিভিন্ন সময়ে তিনি পেয়েছেন মোনাজাতউদ্দিন স্মৃতি পদকসহ একাধিক সম্মাননা। তবে তার সবচেয়ে বড় পুরস্কার ছিল সহকর্মীদের বিশ্বাস। ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন সাদামাটা। স্ত্রী গৃহিণী। মেয়ে শামিনা সাহেদ চৈতি ইংরেজিতে এমএ সম্পন্ন করে কিছুদিন শিক্ষকতা করেছেন। ছেলে তামজিদ হাসান চার্লি ইংরেজিতে এমএ সম্পন্ন করে বর্তমানে একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।

ভোরের যে নিস্তব্ধতায় তার জীবন থেমে গিয়েছিল, সেই নিস্তব্ধতা আজ রংপুরের সংবাদপাড়ায় ছড়িয়ে আছে। সংবাদ ছাপা হবে, সময় এগোবে—কিন্তু কিছু নাম থেকে যাবে ইতিহাস হয়ে।
আব্দুস সাহেদ মন্টু তেমনই এক নাম।
সংবাদ যার পেশা ছিল, আর সত্য ছিল ধর্ম।

Manual6 Ad Code