৯ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৫শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৪শে মহর্‌রম, ১৪৪৮ হিজরি

সাড়ে চার কোটি বিনিয়োগ নথি ঠিক, অদৃশ্য উৎস–আয়ের শেষ গন্তব্য কোথায়?

Editor
প্রকাশিত এপ্রিল ৯, ২০২৬
সাড়ে চার কোটি বিনিয়োগ নথি ঠিক, অদৃশ্য উৎস–আয়ের শেষ গন্তব্য কোথায়?

Manual3 Ad Code

সাড়ে চার কোটি বিনিয়োগ
নথি ঠিক, অদৃশ্য উৎস–আয়ের শেষ গন্তব্য কোথায়?

লোকমান ফারুক, রংপুরঃ রংপুরের সমবায় মার্কেটের ষষ্ঠ তলার ভেতরে ঢুকলে প্রথমেই চোখে পড়ে একটি চলমান দৃশ্য–আলো, শব্দ, মানুষের ভিড়। টেবিলগুলো ভরা, রান্নাঘর ব্যস্ত, ক্যাশ কাউন্টারে হিসাব চলছে। বাইরে থেকে দেখলে এটি একটি সফল রেস্টুরেন্টের সাধারণ গল্প। কিন্তু ভেতরে ঢুকলে বোঝা যায়–এটি কেবল ব্যবসার গল্প নয়। এটি অর্থের উৎস, প্রবাহ এবং নিয়ন্ত্রণের একটি নীরব মানচিত্র।

Manual4 Ad Code

নথি বলছে–তিন কোটি টাকায় বরাদ্দ নেওয়া হয়েছে রেস্টুরেন্টটি। মালিক হিসেবে নাম রয়েছে মারুফা আক্তারের, একজন কাস্টমস ডেপুটি কমিশনারের স্ত্রী। অর্থ জমা দিয়েছেন তার শ্বশুর মাহবুবুর রহমান। কাগজপত্রে কোনো ত্রুটি নেই–চুক্তি, রসিদ, লেনদেন –সবই নিয়মমাফিক। কিন্তু এই শুদ্ধতার ভেতরেই লুকিয়ে আছে একটি অমিল। স্থানীয়দের ভাষ্যে, মাহবুবুর রহমানও কাস্টমসে চাকুরি করেছেন। তার পরিচিত আর্থিক অবস্থার সঙ্গে তিন কোটি টাকার বরাদ্দমূল্য এবং ডেকোরেশনসহ মোট সাড়ে চার কোটি টাকার বিনিয়োগ –এখানেই বৈপরীত্য। একজন স্থানীয় বললেন,”উনার জীবনযাত্রা দেখলে বোঝা যায় –এত বড় অংকের টাকা, একসাথে দেওয়ার মতো সামর্থ্য তার ছিল না।” এই বিনিয়োগের পক্ষে কোনো ট্যাক্স রিটার্ন, ব্যাংক স্টেটমেন্ট বা বড় আয়ের বৈধ নথি পাওয়া যায়নি। সমবায় কর্তৃপক্ষও টাকার উৎস যাচাই করেনি। সবকিছু ঠিকঠাক, যতক্ষণ না টাকার উৎস সম্পর্কে প্রশ্ন করা না হয়: এই অর্থ কোথা থেকে এলো? একজন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বলেন, “নথি ঠিক থাকলে অনেক সময় অন্য কিছু খোঁজ করা হয় না। কিন্তু বড় অংকের ক্ষেত্রে উৎস যাচাই না হওয়া নিজেই একটি প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।”

Manual5 Ad Code

এই অনুসন্ধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ উঠে আসে রেস্টুরেন্টের দৈনন্দিন পরিচালনা থেকে। সরকারি নথিতে মালিকানা যার নামে, কিন্তু বাস্তবে পরিচালনা করছেন অন্যরা–যারা সংশ্লিষ্ট কাস্টমস কর্মকর্তার ঘনিষ্ঠ বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। একজন কর্মচারী বলেন, “রেস্টুরেন্টটি যারা পরিচালনা করেন, তারা মালিক না–কিন্তু সব সিদ্ধান্ত তাদের হাতেই।” আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এসেছে আয়ের প্রবাহ নিয়ে। সূত্র বলছে, রেস্টুরেন্টের আয় সরাসরি আনুষ্ঠানিক পরিচালনা কাঠামোয় সীমাবদ্ধ থাকে না। হিসাব ‘হাত ঘুরিয়ে’ শেষ পর্যন্ত পৌঁছায় ওই কাস্টমস কর্মকর্তার স্ত্রীর কাছে। অর্থাৎ, নথিতে যিনি মালিক–বাস্তবে আয়ও তার কাছেই কেন্দ্রীভূত হচ্ছে; তবে একটি ঘুরপথে। এই ব্যবস্থাটি একটি প্রশ্ন তৈরি করে–এটি কি কেবল একটি ব্যবসা, নাকি একটি নিয়ন্ত্রিত আর্থিক চক্র?

Manual2 Ad Code

অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে–মাহবুবুর রহমানের পরিবার ও ঘনিষ্ঠদের নামে একাধিক সম্পদের তথ্য। আরও রেস্টুরেন্ট, বহুতলা আবাসিক ভবন, জমি, অন্য ব্যবসা–যার আর্থিক পরিমাণ তাদের পরিচিত আয়ের সঙ্গে যায় না। এখানে একটি প্রবণতা স্পষ্ট–সম্পদ ছড়িয়ে আছে বিভিন্ন নামে, কিন্তু সম্পর্কের সুতো একই। একজন অনুসন্ধানকারী বলেন, “এটা বিচ্ছিন্ন কিছু না। এখানে একটি ধারাবাহিকতা আছে–একই বৃত্তের মধ্যে সম্পদ ঘুরছে।” এই গল্পে আনুষ্ঠানিকভাবে সামনে আছেন মাহবুবুর রহমান–অর্থ জমাদাতা হিসেবে। কিন্তু তিনি এখন প্রয়াত। তাই প্রশ্নটি এখন ব্যক্তিকে ছাড়িয়ে কাঠামোর দিকে–তিনি কি প্রকৃত বিনিয়োগকারী ছিলেন? নাকি একটি ‘মুখ’ নামমাত্র–যার মাধ্যমে অর্থ প্রবাহিত হয়েছে? রেস্টুরেন্টের বাস্তব নিয়ন্ত্রণ এবং আয়ের চূড়ান্ত গন্তব্য কি অন্য কোথাও? একটি সম্ভাব্য চিত্র এখানে স্পষ্ট হয়–অর্থ জমা দাতা একজন, নিয়ন্ত্রণ অন্যদিকে, আর অর্থের প্রবাহ তৃতীয় দিকে।

একটি সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর, একাধিক সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু কোনো বিভাগীয় তদন্ত শুরু হয়নি। সমবায় কর্তৃপক্ষও নীরব। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো নীরব। প্রশ্নগুলোও যেন নীরবতার ভেতর আটকে আছে। একজন সাবেক কর্মকর্তা বলেন, “যখন কাগজে সমস্যা থাকে না, তখন অনেক সময় বাস্তবের অসঙ্গতিগুলোকে অদৃশ্য ধরে নেওয়া হয়।”

Manual3 Ad Code

রেস্টুরেন্টে আবার ফিরে গেলে, সবকিছুই স্বাভাবিক।
গ্রাহক আসছে। অর্ডার যাচ্ছে। হিসাব হচ্ছে। কিন্তু এই হিসাবের ভেতরেই আরেকটি হিসাব লুকানো–তিন কোটি টাকার বরাদ্দ। সাড়ে চার কোটি টাকার মোট বিনিয়োগ।
সীমিত আয়ের একজন মানুষের নামে অর্থপ্রদান।
ঘনিষ্ঠজনদের মাধ্যমে পরিচালনা। আর আয়ের প্রবাহ–যা শেষ পর্যন্ত পৌঁছায় অন্য হাতে।

এই গল্পের কোনো নাটকীয় সমাপ্তি নেই। আছে শুধু একটি সরল, কিন্তু ভারী প্রশ্ন–টাকাটা আসলে কার?
আর যদি মালিকানা, নিয়ন্ত্রণ ও আয়ের পথ–এই তিনটি আলাদা দিকে যায়, তাহলে এই ব্যবস্থায় আসল মালিক কে? সমবায় মার্কেটের সেই রেস্টুরেন্টটি এখনও চালু। আলো জ্বলছে। ব্যবসা চলছে। শুধু একটি জিনিস অন্ধকারে রয়ে গেছে–সাড়ে চার কোটি টাকার প্রকৃত উৎস।