১৭ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৪ঠা ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ২৯শে শাবান, ১৪৪৭ হিজরি

পুঁজির শেষ আশ্রয়: ২০২৫ সালের শ্রম অধ্যাদেশ এবং কারখানার মেঝের অলিখিত যুদ্ধ

admin
প্রকাশিত নভেম্বর ১৯, ২০২৫
পুঁজির শেষ আশ্রয়: ২০২৫ সালের শ্রম অধ্যাদেশ এবং কারখানার মেঝের অলিখিত যুদ্ধ

Manual4 Ad Code

পুঁজির শেষ আশ্রয়: ২০২৫ সালের শ্রম অধ্যাদেশ এবং কারখানার মেঝের অলিখিত যুদ্ধ

লোকমান ফারুক বিশেষ প্রতিনিধি : দীর্ঘ দুই দশক ধরে বাংলাদেশের শিল্পাঞ্চলগুলো একটি অলিখিত চুক্তিতে পরিচালিত হয়েছে: মুনাফা আগে, শ্রমিকের জীবন পরে। রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপ এবং অগ্নিকাণ্ডের বিভীষিকা আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণ করলেও, দেশের ভেতরকার ক্ষমতাকাঠামোয় পরিবর্তন ছিল মন্থর। শ্রমিক অধিকারের দাবি প্রায়শই চাপা পড়েছে মালিকপক্ষের অর্থনৈতিক শক্তির নিচে।

Manual7 Ad Code

কিন্তু ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পালাবদল এবং একটি অন্তর্বর্তী সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ সেই চিরায়ত ব্যবস্থায়  সরাসরি আঘাত হেনেছে। জারি হয়েছে বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫—যা কেবল একটি আইনি নথি নয়; এটি দেশের শিল্প ইতিহাসে পুঁজি ও শ্রমের মধ্যেকার অলিখিত যুদ্ধের চূড়ান্ত রেখা এঁকে দিয়েছে। এই অধ্যাদেশটি মালিকদের জন্য কোনো নমনীয় আবেদন নয়, এটি একটি শর্তহীন আত্মসমর্পণের দাবি।

প্রথম অধ্যায়: মালিকের ছায়া থেকে স্বাধীনতার সূর্যোদয়

এই অধ্যাদেশের সবচেয়ে নাটকীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের প্রক্রিয়ায় সরাসরি হস্তক্ষেপ। দশকের পর দশক ধরে, মালিকপক্ষ কৌশলে ‘হলুদ ইউনিয়ন’ বা পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত সংগঠন তৈরি করে শ্রমিকদের আসল কণ্ঠস্বরকে নীরব করে রেখেছিল। ইউনিয়ন গড়ার অসম্ভব উচ্চ নূন্যতম সদস্য সংখ্যা (প্রায়শই মোট শ্রমিকের ৩০ শতাংশ) ছিল মালিকদের হাতে থাকা একটি রক্ষাকবচ।

২০২৫ সালের অধ্যাদেশে সেই রক্ষাকবচ ভেঙে দেওয়া হয়েছে। এখন ইউনিয়ন গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় শ্রমিকের সংখ্যাকে একটি বাস্তবসম্মত স্তরে নামিয়ে আনা হয়েছে, যা কারখানার মেঝের একজন সাধারণ শ্রমিকের হাতে সংগঠিত হওয়ার ক্ষমতা ফিরিয়ে দিয়েছে।

 

এই পরিবর্তন কেবল একটি সংখ্যার হেরফের নয়। এটি মালিকপক্ষের নিয়ন্ত্রণ কাঠামোয় একটি বিপ্লবী ফাটল সৃষ্টি করেছে। এখন আর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার পছন্দের লোক নয়, কারখানার ফ্লোর থেকে উঠে আসা প্রকৃত নেতৃত্ব আইনি বৈধতা পাওয়ার পথে হাঁটতে পারবে। এই পরিবর্তনই মূলত আগামী দিনের শিল্প সংঘাতের জন্ম দেবে—কারণ মালিক এখন আলাপ করতে বাধ্য হবে এমন শক্তির সঙ্গে, যাদের তারা এতদিন উপেক্ষা করে এসেছে।

দ্বিতীয় অধ্যায়: শাস্তির লৌহদণ্ড ও জবাবদিহিতার জাল

যদি স্বাধীন ইউনিয়ন ও শ্রমিকদের প্রতিরক্ষার ঢাল হয়, তবে শাস্তির পরিমাণ বহুগুণ বৃদ্ধি হলো সেই আক্রমণাত্মক অস্ত্র, যা মালিকদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হবে।

পূর্বে, শ্রম আইন লঙ্ঘনের জরিমানা ছিল এতটাই সামান্য যে তা ছিল স্রেফ ‘ব্যবসার খরচ’ (Cost of Doing Business)। হাজার হাজার কোটি টাকা মুনাফাকারী একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে কয়ক হাজার টাকা জরিমানা ছিল তুচ্ছ। অধ্যাদেশটি সেই সমীকরণ পাল্টে দিয়েছে।

Manual7 Ad Code

ব্যর্থতার মূল্য: গুরুতর অপরাধ (যেমন—নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতির কারণে শ্রমিকের জীবনহানি) এবং বারবার আইন লঙ্ঘনের জন্য আর্থিক জরিমানা বৃদ্ধি করা হয়েছে। কৌশলগতভাবে, এই জরিমানা এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে যাতে আইন মানার খরচ আইন ভাঙার খরচের চেয়ে অনেক কম হয়।

ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা: সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে দণ্ডের ক্ষেত্রে। কেবল প্রতিষ্ঠান নয়, গুরুতর লঙ্ঘনের দায়ে সংশ্লিষ্ট মালিক বা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার জন্য কারাদণ্ডের মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়েছে। এটি একটি স্পষ্ট বার্তা: অপরাধের মূল্য এখন শুধু কোম্পানির ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে নয়, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা থেকেও দিতে হতে পারে।

এই কঠোরতা আরও নিশ্চিত করেছে শ্রমিকের সংজ্ঞা বিস্তৃতকরণ। প্রথমবারের মতো গৃহকর্মী ও নাবিকদের শ্রম আইনের আওতায় এনে সরকার মালিকদের জবাবদিহিতার জালকে ঘরের চার দেয়াল পর্যন্ত বিস্তৃত করেছে। সেই সঙ্গে, শ্রমিককে ব্ল্যাকলিস্টিং করার প্রথাকে অবৈধ ঘোষণা করে, মালিকদের হাতে থাকা নীরব প্রতিশোধের অস্ত্রটিও কেড়ে নেওয়া হয়েছে।

তৃতীয় অধ্যায়: প্রহরী ও অদৃশ্য সংঘাত

Manual5 Ad Code

আইন যত কঠোরই হোক, এর কার্যকারিতা নির্ভর করে পরিদর্শকদের ওপর। এই ব্যবস্থার কঠোরতা আনতে অধ্যাদেশে যা বলা হয়েছে, তা কাগজে কলমে অত্যন্ত শক্তিশালী: পরিদর্শকদের স্বাধীনতা বৃদ্ধি এবং বিশেষায়িত নিরীক্ষা দল গঠন।

কিন্তু এখানে প্রশ্নটি ওঠে, যা অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মূল ভিত্তি: সরকারের সদিচ্ছা কি শেষ পর্যন্ত টেকসই হবে?

পরিদর্শক যখন ফ্যাক্টরির গেটে প্রবেশ করেন, তখন তিনি কেবল একটি ভবন দেখেন না, তিনি দেখেন কোটি কোটি টাকার পুঁজি এবং রাজনৈতিক প্রভাব। যদি এই নতুন পরিদর্শন ব্যবস্থা মালিকপক্ষের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ থেকে মুক্ত রাখা না হয়, তবে কঠোর আইনও পুরোনো অভ্যাসে ফিরে যাবে—পরিদর্শন হয়ে উঠবে নিছক আনুষ্ঠানিকতা।

Manual7 Ad Code

উপসংহার: ট্র্যাজেডি নাকি ট্রায়াম্ফ?

বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫, দেশের জন্য একটি পরিবর্তনশীল দলিল। এটি শ্রমিকদের হাতে স্বাধীনভাবে সংগঠিত হওয়ার অস্ত্র, এবং রাষ্ট্রের হাতে মালিকদের জবাবদিহি করার অস্ত্র তুলে দিয়েছে।

তবে, এই আইনের ভাগ্য নির্ধারণ হবে সংসদ বা গেজেটে নয়, বরং শ্রম আদালত ও কারখানার মেঝের অলিখিত সংঘাতের মাধ্যমে। যদি শ্রম আদালতগুলো নতুন, কঠোর ধারাগুলো দ্রুততার সঙ্গে কার্যকর করতে ব্যর্থ হয়, তবে বিচারের দীর্ঘসূত্রতা মালিকদের জন্য সুবিধা দেবে। যদি সরকার তার প্রধান অর্থনৈতিক শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখাতে পিছু হটে, তবে এই অধ্যাদেশও অতীতের অসংখ্য আইনি সংস্কারের মতো অকার্যকর হয়ে যাবে।

শ্রমিক অধিকারের এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে, প্রশ্নটি রয়ে গেল: দেশের শিল্প ইতিহাসে এই অধ্যাদেশটি কি কেবল একটি উচ্চাকাঙ্ক্ষী ট্র্যাজেডি হিসেবে নথিভুক্ত হবে, নাকি হবে শ্রমের অবিচল বিজয়ের সূচনা? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে আমাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখতে হবে রাজধানী এবং শিল্পাঞ্চলের ক্ষমতা কাঠামোর দিকে।