৯ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৫শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৪শে মহর্‌রম, ১৪৪৮ হিজরি

মেইন রোডের ধুলো নয়, নীরব বিষ: রংপুরে তামাক ক্রাসিংয়ের বিস্তার

Editor
প্রকাশিত এপ্রিল ৭, ২০২৬
মেইন রোডের ধুলো নয়, নীরব বিষ: রংপুরে তামাক ক্রাসিংয়ের বিস্তার

Manual7 Ad Code

মেইন রোডের ধুলো নয়, নীরব বিষ: রংপুরে তামাক ক্রাসিংয়ের বিস্তার

লোকমান ফারুক, রংপুরঃ রংপুরের পাগলাপীর ডালিয়া রোড থেকে সদর থানা এলাকার বিস্তৃত মেইন রোড। এখানে বসতবাড়ি, বাজার ও বিদ্যালয়ের ঠিক পাশেই গড়ে উঠেছে একাধিক তামাক প্রক্রিয়াজাতকরণ মিল ও কারখানা–যেগুলো শুধু পরিবেশ নয়, মানবাধিকার ও শ্রমিক নিরাপত্তা সম্পর্কেও বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।

Manual7 Ad Code

এলাকার বাসিন্দারা জানান, সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মিলগুলো থেকে বের হওয়া তামাকের গুঁড়া বাতাসে ভেসে থাকে। ঘরে ধুলোর আস্তরণ জমে। “জানালা বন্ধ রাখলে কিছুটা ঠিক লাগে, কিন্তু ধুলো তো বাতাসে ভাসে,” বললেন একজন স্থানীয় শিক্ষক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে –তামাক শিল্পের কাছাকাছি বসবাস করলে বায়ু ও পানি দূষণের মাত্রা বাড়ে, যা জনস্বাস্থ্যে ঝুঁকি সৃষ্টি করে।
স্থানীয় একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষক বললেন, “বাচ্চারা ক্লাসে কাশি করে, চোখও জ্বালা পোড়া করে।”
এমন অভিযোগ শুধু এক দুইজনের নয়–অনেকেই একই সমস্যা তুলে ধরেছেন।

এই মিলগুলোতে কাজ করেন শত শত শ্রমিক।
তাদের দাবি–দৈনিক কাজের সময় লম্বা, ওভারটাইমের মজুরি দেওয়া হয় না, আর সুরক্ষা ব্যবস্থা শূন্য।
বাংলাদেশের শ্রম আইন অনুযায়ী শ্রমিকদের কাজের সময় ও নিরাপত্তা নির্দিষ্ট করে। কিন্তু মাঠে দেখা গেছে –এই মৌলিক অধিকারগুলো কার্যত লঙ্ঘিত হচ্ছে।
শ্রমিকদের মধ্যে অনেকেই বলেন, “আমরা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করি। মজুরি কম, স্বাস্থ্য সুরক্ষার ব্যবস্থা নেই।” এমন শোষণ শুধু অমানবিক নয়–এটি শ্রম আইনের মৌলিক নীতিরও বিরোধী। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গ্লোবাল সাপ্লাই চেইনে শ্রমিকদের মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না করা হলে তা মানবাধিকার লঙ্ঘনে পরিণত হয়।

Manual2 Ad Code

আইন অনুযায়ী, শিল্প স্থাপনের আগে পরিবেশ ছাড়পত্র নিতে হয়, নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখতে হয়, এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হয়। কিন্তু সরেজমিনে দেখা গেছে–অনেক মিলই স্কুল, বাজার ও বসতবাড়ি ও রাস্তার ঠিক পাশেই অবস্থান করছে; কোনো অনুমোদন বা পরিবেশগত নজরদারি ছাড়াই।
এতে প্রশ্ন ওঠে–এই মিলগুলোর তদারকি কে করছে?
এবং পরিবেশ ও শ্রম আইন বাস্তবে কতটা কার্যকর?
তামাক শিল্পের ধুলো শুধু শ্বাসকষ্ট বা অ্যালার্জির কারণ নয়। দীর্ঘ সময় ধরে এই সূক্ষ্ম কণার সংস্পর্শে থাকলে ফুসফুসের রোগ, হৃদরোগসহ নানা জটিল স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, তামাক প্রক্রিয়াজাতকরণে কাজ করার সময় ধুলোর সঙ্গে সরাসরি সংস্পর্শে থাকলে শরীরে বিষক্রিয়ার মতো প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। তামাকের গুরো ও ধুলো শুধু শ্বাসকষ্ট বা অ্যালার্জির কারণ নয়। দীর্ঘ সময় ধরে এই সূক্ষ্ম কণার সংস্পর্শে থাকলে ফুসফুসের রোগ, হৃদরোগসহ নানা ধরনের জটিল স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে। বিশেষ করে ফুসফুসে।
শ্রমিকদের অনেকেই এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন,
“কখনো কখনো শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। আমরা জানি এ কাজ ভালো নয়, তবুও বাধ্য হয়ে কাজ করতে হয়।”

রংপুর অঞ্চলে তামাক চাষ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ একটি বড় অর্থনৈতিক কার্যক্রম। বহু কৃষক এই চাষের সঙ্গে যুক্ত, আর মিলগুলো স্থানীয় কর্মসংস্থানের একটি উৎস হিসেবে কাজ করছে। কিন্তু এই খাতের সঙ্গে পরিবেশগত ক্ষতি, শ্রমিক শোষণ এবং জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে। ফলে, এটি আর শুধুমাত্র “অর্থনৈতিক সুবিধা’র জায়গায় সীমাবদ্ধ থাকছে না–বরং একটি বিতর্কিত ও ঝুঁকিপূর্ণ শিল্প হিসেবে প্রশ্নের মুখে পড়ছে।যোগাযোগ করলে একজন তামাক ক্রাসিং মিল মালিক বলেন, ” আমরা স্থানীয়দের কর্মসংস্থান দিচ্ছি। পরিবেশের ক্ষতি–এমন কোনো প্রমাণ নেই।” তবে তিনি পরিবেশ ছাড়পত্র বা শ্রমিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত কোনো নথি দেখাতে ব্যর্থ হন।

Manual7 Ad Code

একদিকে বাসা, বাজার, স্কুলের ঠিক পাশেই মিলগুলো;
অন্যদিকে–ধুলো, শ্রমিক শোষণ, স্বাস্থ্যঝুঁকি। এখন প্রশ্ন হলো–এগুলো কীভাবে অনুমোদন ছাড়াই চলে?
কেন পরিবেশ ও শ্রম আইন মাঠে কার্যকর হচ্ছে না?
এবং এই পরিস্থিতি থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় কি?

Manual7 Ad Code