৯ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৫শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৪শে মহর্‌রম, ১৪৪৮ হিজরি

সাক্ষ্যহীন এক সাক্ষী: সোহাগের অপেক্ষা, বিচার প্রক্রিয়ার প্রশ্ন

Editor
প্রকাশিত এপ্রিল ৭, ২০২৬
সাক্ষ্যহীন এক সাক্ষী: সোহাগের অপেক্ষা, বিচার প্রক্রিয়ার প্রশ্ন

Manual2 Ad Code

সাক্ষ্যহীন এক সাক্ষী: সোহাগের অপেক্ষা, বিচার প্রক্রিয়ার প্রশ্ন

লোকমান ফারুক, রংপুরঃ রংপুরের এক তরুণ দাঁড়িয়ে আছেন ঘটনার ভেতর থেকে উঠে আসা একজন মানুষ, কিন্তু এখন যেন ঘটনার বাইরেই পড়ে আছেন। নাম তার শাহরিয়ার সোহাগ। তিনি বলেন, তিনি দেখেছেন। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। কিন্তু সেই দেখা এখনো কাগজে ওঠেনি।

Manual3 Ad Code

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষার্থী দাবি করেন, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের আন্দোলনের দিনগুলোতে তিনি ছিলেন ঘটনাস্থলে। প্রতিদিন। প্রতিটি উত্তেজনা, প্রতিটি ছত্রভঙ্গ, প্রতিটি আতঙ্ক—তার চোখের সামনে দিয়ে গেছে। তার ভাষায়, “সবকিছুই দেখেছি, কিন্তু আমার দেখাটা এখনো রেকর্ড হয়নি।” সোহাগের বক্তব্যে দৃশ্যপটটি খুব সাধারণভাবে শুরু হয়,শিক্ষার্থীদের অবস্থান কর্মসূচি। শান্তিপূর্ণ। স্লোগান, ব্যানার, অপেক্ষা। কিন্তু সময়ের মতোই পরিস্থিতিও বদলায়। একসময় মুখোমুখি অবস্থান। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, রাজনৈতিক সংগঠনের কর্মী, আর মাঝখানে শিক্ষার্থীরা। তারপর গুলির শব্দ–হঠাৎ, তীক্ষ্ণ, বিভ্রান্তিকর। সেই গুলিতেই আহত হন আবু সাঈদ। পরে হাসপাতালের বিছানায় তার মৃত্যু হয়। ঘটনাটি তখনই আলোচনায় আসে, কিন্তু তার ভেতরের বয়ানগুলো ছড়িয়ে পড়ে আলাদা আলাদা পথে।

Manual2 Ad Code

সোহাগ বলেন, তিনি নিজেও সেদিন গুলিবিদ্ধ হন। সহপাঠীরা তাকে সরিয়ে নেয়। এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায়—নিরাপত্তার খোঁজে। তার নিজের শরীর তখন প্রমাণ, কিন্তু তার বয়ান এখনো অমুদ্রিত।
তদন্তের শুরুতে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তাকে যোগাযোগ করে। তিনি সহযোগিতা করেন। এরপর মামলাটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে যায়। ২০২৫ সালের আগস্টে তাকে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য ডাকা হয়। কিন্তু সেখানে তিনি একটি প্রস্তুত করা খসড়া দেখতে পান–যা, তার দাবি অনুযায়ী, তার নিজের কথার সঙ্গে মেলে না। “আমি আপত্তি জানিয়েছিলাম,” –তিনি বলেন। “কারণ এটা আমার কথা না।”
এরপর থেকে আর কোনো ডাক আসেনি। একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলার একজন প্রত্যক্ষদর্শী–যিনি নিজেও আহত, তিনি অপেক্ষায় আছেন, কিন্তু তার জন্য আদালতের দরজা এখনো খোলেনি। এই অবস্থায় তিনি সংবাদ সম্মেলনে এসে কথা বলেন। তার ভাষা সরল, অভিযোগ স্পষ্ট। “আমার সাক্ষ্য না নিলে বিচার প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।” তার বক্তব্যে কোনো নাটকীয়তা নেই। বরং আছে এক ধরনের স্থিরতা–যেন তিনি জানেন, তার কাজ শুধু বলা। শোনা হবে কি না, সেটা তার হাতে নেই। আইন বলে, প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ।

বিচারপ্রক্রিয়ার ভিত্তি দাঁড়িয়ে থাকে তথ্য, প্রমাণ আর মানুষের বয়ানের ওপর। কিন্তু যদি সেই বয়ানই অনুপস্থিত থাকে–তাহলে কি থাকে? ২০২৪ সালের ১৭ আগস্ট আবু সাঈদের বড় ভাই বাদী হয়ে তাজহাট থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলাটি এখন বিচারাধীন। কাগজপত্র এগোচ্ছে, শুনানি হচ্ছে, কিন্তু একজন সাক্ষীর কণ্ঠ এখনো আদালতের ভেতরে পৌঁছায়নি।
সোহাগের দাবি খুব সংক্ষিপ্ত–তার সাক্ষ্য নেওয়া হোক, সঠিকভাবে নেওয়া হোক। তিনি বলেন, ” ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য সত্য বলা জরুরি।”

কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়–একজন সাক্ষী যখন নিজেই তার সাক্ষ্যের জন্য অপেক্ষা করেন, তখন বিচার কোথায় দাঁড়িয়ে থাকে? আর সত্য যদি দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে, ভেতরে যে বিচার চলছে–সেটা কাদের জন্য?

Manual2 Ad Code