৯ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৫শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৪শে মহর্‌রম, ১৪৪৮ হিজরি

লাইসেন্সে একক নিয়ন্ত্রণ, বোনাসে স্থবিরতা–শ্রম পরিদর্শনের প্রশ্নে অপরিবর্তিত বাস্তবতা

Editor
প্রকাশিত এপ্রিল ২, ২০২৬
লাইসেন্সে একক নিয়ন্ত্রণ, বোনাসে স্থবিরতা–শ্রম পরিদর্শনের প্রশ্নে অপরিবর্তিত বাস্তবতা

Manual2 Ad Code

লাইসেন্সে একক নিয়ন্ত্রণ, বোনাসে স্থবিরতা–শ্রম পরিদর্শনের প্রশ্নে অপরিবর্তিত বাস্তবতা

লোকমান ফারুক, রংপুরঃ রংপুরের আঞ্চলিক শ্রম পরিদর্শন কার্যালয়ে দিন বদলায়, কিন্তু গল্প বদলায় না। করিডোরে সেই একই অপেক্ষা। একই ফাইল। একই অস্থির চোখ। ঈদের আগে যে প্রশ্নগুলো ঝুলে ছিল, ঈদের পরও সেগুলো বাতাসে ভাসছে–অমীমাংসিত, অনুত্তরিত।

অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, রংপুর অঞ্চলে কলকারখানা ও শিল্প প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স প্রদান ও নবায়ন প্রক্রিয়ায় একজন নির্দিষ্ট কর্মকর্তার প্রভাব নিয়ে একাধিক অভিযোগ উঠেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক উদ্যোক্তা জানিয়েছেন–লাইসেন্স সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ ফাইলগুলো দপ্তরের একজন শীর্ষ কর্মকর্তার দপ্তরেই ঘুরপাক খাওয়ার পর সমাধানে আসতে হয়।
একজন উদ্যোক্তার ভাষায়–”ফাইলটা যেন এক দরজার সামনে এসে থেমে যায়। দরজা খোলে, কিন্তু ভেতরে ঢোকার শর্ত থাকে।” প্রশাসনিক নিয়ম অনুযায়ী লাইসেন্স প্রক্রিয়া হওয়া উচিত নথি যাচাই, মাঠপর্যায়ের পরিদর্শন এবং নির্ধারিত ধাপ অনুসরণ করে। কিন্তু বাস্তবতার অভিযোগ–একক সিদ্ধান্ত ও ব্যক্তিগত যোগাযোগ অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারক হয়ে উঠে। একজন অভিজ্ঞ ব্যবসায়ী বললেন–”নিয়মের বই আছে, কিন্তু চাবি আছে একজনের হাতে।” এই ‘একজন’–নামটি কেউ প্রকাশ্যে বলতে চান না। কিন্তু ইঙ্গিত স্পষ্ট–দপ্তরের কেন্দ্রে ব্যক্তিকেন্দ্রিক নিয়ন্ত্রণ তৈরি হয়েছে।

Manual8 Ad Code

একাধিক সূত্র জানায়, লাইসেন্সের ক্ষেত্রে ফাইল আটকে রাখা বা অগ্রগতি বিলম্বিত করার অভিযোগও রয়েছে।
একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা বললেন–”বারবার বলছে, ‘আরেকটু সময় লাগবে’। কিন্তু সেই ‘সময়’ আর শেষ হয় না। এই ‘সময়’–কখনো অজুহাত, কখনো চাপ, কখনো দরকষাকষির ক্ষেত্র। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ নয়। বরং একটি অদৃশ্য প্রক্রিয়া –নির্ধারিত নিয়মের চেয়ে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়।

বাংলাদেশ শ্রম আইন অনুযায়ী, উৎসব বোনাস শ্রমিকদের একটি বাধ্যতামূলক অধিকার। কিন্তু রংপুর অঞ্চলে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। একজন শ্রমিক নেতা বলেন–
“বোনাস দেওয়া না দেওয়ার বিষয়টা এখন অনেক জায়গায় ইচ্ছার উপর নির্ভর করে।” ঈদের আগে যে অভিযোগ ছিল, অনেক প্রতিষ্ঠান বোনাস দিচ্ছে না বা আংশিক দিচ্ছে–ঈদের পরেও সেই অভিযোগ একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। একজন শ্রমিকের ভাষায়–
“ঈদ চলে গেছে, কিন্তু পাওনার হিসাব যায়নি।”
শ্রমিকদের মতে, নিয়মিত ও কার্যকর পরিদর্শন না থাকায় মালিকপক্ষের উপর চাপ তৈরি হচ্ছে না।
একজন সিনিয়র শ্রমিক সংগঠক বলেন–”আইন আছে, কিন্তু আইন যদি মাঠে না নামে, তাহলে সেটা শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে।”

Manual8 Ad Code

পরিদর্শন কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন সবচেয়ে বেশি। একাধিক প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক নেতাদের দাবি–নিয়মিত ও কার্যকর পরিদর্শন চোখে পড়ে না। কিছু ক্ষেত্রে পরিদর্শন হলেও তার ফলাফল স্পষ্ট নয়। একজন শ্রমিক আমাকে বলেছেন–”যারা আসেন, তারা যান। কিন্তু কিছু বদলায় না।” এটি একটি স্থির চিত্র–পরিদর্শন আছে, কিন্তু তার প্রভাব অনুপস্থিত। একজন পর্যবেক্ষক মন্তব্য করেন –”পরিদর্শন যদি ছায়ার মতো হয়, তাহলে আলো কোথায়?” অনুসন্ধানে উঠে এসেছে একটি জটিল কাঠামো–যেখানে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, উদ্যোক্তা, এবং অভ্যন্তরীণ প্রভাব-সব মিলিয়ে একটি নেটওয়ার্ক। এই নেটওয়ার্কের ভেতরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ধীরে, কিন্তু প্রভাব পড়ে দ্রুত। ওয়াকিবহাল সূত্র বলেছেন-“এখানে সবকিছু লেখা থাকে না। কিছু জিনিস চলে অলিখিত নিয়মে। “এই অলিখিত নিয়ম-যেটা নথিতে নেই, কিন্তু বাস্তবতায় শক্তিশালী।

Manual8 Ad Code

লাইসেন্সের ক্ষেত্রে অস্বচ্ছতা, বোনাসে অনিয়ম, আর পরিদর্শনে অনুপস্থিতি–এই তিনটি বিষয় মিলিয়ে একটি বড় প্রশ্ন দাঁড়ায়। শ্রমিকদের জন্য–এটি অধিকার হারানোর গল্প। উদ্যোক্তাদের জন্য–একটি হয়রানির বোঝা। আর ভুক্তভোগীদের জন্য–এটি বিশ্বাসের সংকট। আইন যদি সমানভাবে প্রয়োগ না হয়, তাহলে সমতা কোথায়? একজন প্রবীণ শ্রমিক নেতা বললেন–
“যেখানে নিয়ম দুর্বল, সেখানে শক্তিশালী হয় প্রভাব।”

Manual4 Ad Code

করিডোরে আবারও একজন শ্রমিক নেতা দাঁড়িয়ে তিনি বললেন–”একটা দপ্তরে বারবার ঘুরতে ঘুরতে মনে হয়, শ্রমিকের অধিকারও যেন ফাইলের মতো আটকে যায়। আমরা আসি, বলি, অনুরোধ করি–কিন্তু অনেক সময় তাতে কাজ হয় না।” তিনি থামেন। করিডোরের নীরবতা আরও ভারী হয়ে ওঠে। তারপর আবার–”যারা কথা বলার সুযোগ পায় না, তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বোনাস, ওভারটাইম, ছুটি–সবকিছুর জন্যই আমাদের এই দপ্তরে আসতে হয়। কিন্তু যদি এখানেই বারবার ঘুরতে হয়, তাহলে শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত হবে কীভাবে?”

প্রশ্নটা তাই আবার ফিরে আসে–এই ব্যবস্থায় শ্রমিকরা কি তাদের ন্যায্য অধিকার পাচ্ছে, নাকি শুধু ঘুরপাক খাচ্ছে দপ্তরের করিডোরে? আর তার চেয়েও বড় প্রশ্ন-যে ব্যবস্থা শ্রমিকের পাশে দাঁড়ানোর কথা, সেই ব্যবস্থাই কি তাদের ক্লান্তির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে?