৯ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৫শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৬শে সফর, ১৪৪৮ হিজরি

পীরগাছার শল্লার বিল: ঘর উঠেছে, আস্থা ভেঙেছে

Editor
প্রকাশিত ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০২৬
পীরগাছার শল্লার বিল: ঘর উঠেছে, আস্থা ভেঙেছে

Manual1 Ad Code

পীরগাছার শল্লার বিল: ঘর উঠেছে, আস্থা ভেঙেছে

লোকমান ফারুকঃ শল্লার বিলের ভোরটা কুয়াশায় ঢাকা। দূর থেকে সারিবদ্ধ টিনের ঘরগুলোকে নতুন আশ্রয়ের মতোই লাগে রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতির ঝকঝকে প্রতীক। কিন্তু কাছে গেলে বোঝা যায়, দেয়ালের প্লাস্টার খসে পড়ছে, মেঝের ফাটলে জমে আছে বর্ষার জল। যেন ইট-সিমেন্টে লেখা একটি প্রশ্ন এই ঘর কার জন্য, আর কার খরচে?

রংপুরের পীরগাছায় আশ্রয়ণ প্রকল্পে প্রায় ১০ কোটি টাকা আত্মসাৎ, কাবিখা-কাবিটা-টিআর কর্মসূচিতে অনিয়ম, ঘর বরাদ্দে উৎকোচ, অস্তিত্বহীন প্রকল্পে বিল উত্তোলন এমন এক জালের অভিযোগ ঘিরে রয়েছে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাজমুল হক সুমনকে। বর্তমানে তিনি ঠাকুরগাঁওয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিসি) হিসেবে কর্মরত। জেলা প্রশাসন ও দুর্নীতি দমন কমিশন দুদক দুটি পৃথক টিম গঠন করে তদন্ত শুরু করেছে। কিন্তু শল্লার বিলে দাঁড়িয়ে প্রশ্নটা অন্য তদন্ত কি কেবল কাগজে সীমাবদ্ধ থাকবে?

 

বরাদ্দের অঙ্ক, বাস্তবের ফাঁক

মুজিব বর্ষে ভূমিহীনদের ঘর দিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে তৃতীয় ও চতুর্থ ধাপে প্রায় ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ। ৪৩০টি ঘর প্রতিটি ৩ লাখ ৪ হাজার টাকা। কাগজে অঙ্ক মেলে। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, নিম্নমানের নির্মাণে প্রতিটি ঘর থেকে প্রায় এক লাখ টাকা করে কমানো হয়েছে। মোট অনিয়ম প্রায় চার কোটি টাকা।

আরও অভিযোগ ড্রেজার দিয়ে গভীর খনন করে অতিরিক্ত মাটি বিক্রি; মূল্য প্রায় চার কোটি টাকা। কাবিখা প্রকল্পে শ্রমিকের বদলে মেশিন ব্যবহার; বালু বিক্রি করে দেড় কোটি টাকা আত্মসাৎ। সব মিলিয়ে, অঙ্কের গাণিতিক হিসাবের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে নৈতিক হিসাবের ঘাটতি।

দুদকের সহকারী পরিচালক ইসমাইল হোসেন বলেন, “অভিযোগ তদন্তাধীন। সাবেক ইউএনওকে ডাকা হলেও তিনি উপস্থিত হননি।” গত ৫ ফেব্রুয়ারি দুদকের উপ-পরিচালক মনিরুল ইসলামের নেতৃত্বে সাত সদস্যের বিশেষ টিম নতুন করে তদন্ত শুরু করেছে।

ঘর আছে, কিন্তু জীবনযাপন?

Manual7 Ad Code

সরকারি নীতিমালা বলছে পুনর্বাসনে কমিউনিটি সেন্টার, ক্লিনিক, ধর্মীয় উপাসনালয়, কবরস্থান, স্কুল, খেলার মাঠ ও অভ্যন্তরীণ সড়ক থাকতে হবে। শল্লার বিলে নেই কিছুই। তাসনিম ও কহিনুর বেগমসহ চারজনের মৃত্যু হয়েছে; কবরস্থানের অভাবে বাইরে দাফন। ১০টি পরিবার এক নলকূপে নির্ভরশীল। বর্ষায় দেড়-তিন ফুট উঁচু ভরাট জমি পানিতে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা। এক বাসিন্দার কণ্ঠে ক্ষোভ: “ঘর পাইছি, কিন্তু নিরাপত্তা পাইনি। দেয়াল আছে, ভরসা নাই।”

Manual4 Ad Code

উৎকোচের টোকেন

ঘর পেতে ১০ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হয়েছে এমন অভিযোগ একাধিক সুবিধাভোগীর। বিশেষ টোকেনের মাধ্যমে তালিকা চূড়ান্ত। স্থানীয়দের দাবি প্রকৃত দরিদ্র বাদ, অর্থদাতার অগ্রাধিকার। সম্ভাব্য অবৈধ আদায় প্রায় এক কোটি টাকা। এ যেন রাষ্ট্রের করুণা নয়, দর-কষাকষির বাজার।

কাগজে প্রকল্প, মাঠে শূন্যতা

পীরগাছা উপজেলা পরিষদের ২০২৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারির রেজুলেশনে পারুল ইউনিয়নে তিনটি গণশৌচাগারের জন্য বরাদ্দ ১ লাখ ৫৪ হাজার ৭০০ টাকা। বাস্তবে কোনো শৌচাগার নেই। ইটাকুমারিতে আইপিএস-সিসি ক্যামেরা প্রকল্প ছয়টি ক্যামেরা কার্টুনবন্দি। তরোণির ভিটা কবরস্থান ও বালাচাটা হাফিজিয়া মাদরাসার নামে বরাদ্দ স্থানীয়দের দাবি, এমন প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্বই নেই। ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য সুমন মির্জা প্রশ্ন করেন, “প্রতিষ্ঠান নাই, টাকা গেল কই?”

ক্ষমতার ছায়া ও নেটওয়ার্ক

অভিযোগের কেন্দ্রে শুধু একজন কর্মকর্তা নন একটি সম্পর্কের চক্র। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশির প্রভাব ব্যবহার করে অভিযুক্ত কর্মকর্তা দীর্ঘদিন দৃশ্যমান ব্যবস্থা এড়িয়েছেন।

Manual8 Ad Code

অভিযোগ আছে অস্থায়ী প্রকল্প কর্মকর্তাদের নিয়ম ভেঙে ইউনিয়ন প্রশাসক নিয়োগ; ওয়েবসাইটে সাবেক জনপ্রতিনিধিদের তথ্য বিলম্বে অপসারণ; সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সাইবার নিরাপত্তা আইনে মামলা।

একজন বাদী স্বীকার করেছেন ইউএনওর পরামর্শেই মামলা। আর সাংবাদিকদের দাবি তথ্য অধিকার আইনে তথ্য চাওয়ার পর থেকেই চাপ ও মামলার উদ্ভব।

এ যেন “ফাইল”  আর “ফৌজদারি” দুই হাতিয়ারেই নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা।

ইসলামিক রিলিফ বিতর্ক

ঈদুল আজহায় ইসলামিক রিলিফ বাংলাদেশ-এর ৩৫টি গরুর মাংস বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ। ১,২২৫ জন হতদরিদ্রের তালিকায় যুক্ত হয় সরকারি কর্মচারী ও প্রভাবশালীদের নাম। সংস্থার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “চাহিদার তালিকা এসেছে প্রশাসনের কাছ থেকে।”

Manual6 Ad Code

তদন্ত ও বিলম্বের ছায়া

দুদকের প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পরও দীর্ঘ সময় দৃশ্যমান ব্যবস্থা হয়নি। স্থানীয়দের অভিযোগ—বর্তমান পদমর্যাদা ব্যবহার করে তদন্ত প্রভাবিত করার চেষ্টা চলছে।

রংপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আবু সাঈদ বলেন, “জেলা প্রশাসকের নির্দেশে অভিযোগগুলো তদন্ত হচ্ছে। প্রমাণ মিললে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

কিন্তু অভিযুক্ত কর্মকর্তা আগেও অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

বৈপরীত্যের প্রতিচ্ছবি

রাষ্ট্র বলেছিল “আশ্রয়”। বাসিন্দারা বলছেন “আশঙ্কা”।

কাগজে ২০ কোটি, মাঠে ফাটল ধরা দেয়াল। নীতিমালায় কল্যাণ, বাস্তবে উৎকোচ। তদন্তের ঘোষণা, কিন্তু অনিশ্চয়তার দীর্ঘশ্বাস। শল্লার বিলের ঘরগুলো সন্ধ্যায় সূর্যের আলোয় লাল হয়ে ওঠে যেন রক্তিম বিবেকের স্মারক।

প্রশ্নগুলো বাতাসে ভাসে কারা লাভবান? কারা রক্ষা করছে? কারা ক্ষতিগ্রস্ত? যদি তদন্তের সুতো সত্যিই টানা হয়, তবে বেরিয়ে আসবে শুধু অর্থের হিসাব নয় একটি নেটওয়ার্কের মানচিত্র।

শুরুতে ছিল ঘর; শেষে দাঁড়ায় আস্থা।

শল্লার বিলে ঘর উঠেছে আস্থা কি উঠবে?