৯ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৫শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৬শে সফর, ১৪৪৮ হিজরি

নীলফামারীতে মৃত্যুফাঁদে পরিণত স্কুল ভবন

Editor
প্রকাশিত ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২৬
নীলফামারীতে মৃত্যুফাঁদে পরিণত স্কুল ভবন

Manual6 Ad Code

নীলফামারীতে মৃত্যুফাঁদে পরিণত স্কুল ভবন

শেখ স্বপ্না শিমুঃ দূর থেকে দেখলে মনে হবে এটি কোনো পরিত্যক্ত ভবন। কিন্তু বাস্তবে এটি একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। জরাজীর্ণ এই মৃত্যুফাঁদেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলছে প্রায় ১০০ শিক্ষার্থীর পাঠদান কার্যক্রম।
নীলফামারী জেলার কিশোরগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত ডুমুরিয়া আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

নীলফামারী জেলার কিশোরগঞ্জ উপজেলার ডুমুরিয়া আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায় এমন বেহাল চিত্র।সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, প্রধান ভবনের চারটি কক্ষেরই জরাজীর্ণ দশা। ছাদের পলেস্তারা যত্রতত্র খসে পড়ছে। পলেস্তারা খসে পড়ে বিমের রড বেরিয়ে জং ধরেছে। দেয়ালগুলো স্যাঁতসেঁতে। পর্যাপ্ত বেঞ্চের অভাবে মেঝেতেই পাঠদান কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছে শিক্ষার্থীরা। বিদ্যালয়ে রয়েছে বিশুদ্ধ খাবার পানির চরম অভাব। নেই শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত ওয়াশ ব্লক।

মাঠ থাকলেও তা খেলাধুলার অনুপযোগী। স্কুল ভবনের চারপাশে নেই কোনো সীমানা প্রাচীর। শিক্ষার্থীদের শরীরচর্চার জন্য নেই কোনো উপকরণও। এতে শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়া বর্ষা মৌসুমে ছাদ চুঁইয়ে পানি পড়া এখানকার নিত্যদিনের চিত্র।

জানা যায়, ডুমুরিয়া আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি ১৯৩৯ সালে মো. আছের উদ্দিন ও মো. আমির আলীর ১০০ শতক জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই স্কুলটি অবহেলিত। পরবর্তীতে ১৯৭৩ সালে জাতীয়করণ করা হলে প্রতিষ্ঠানটি একটি একতলা ভবন বরাদ্দ পায়। বর্তমানে ভবনটি সংস্কারের অভাবে নাজুক হয়ে পড়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এই ভবনেই প্রতিদিন পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছেন শিক্ষকরা, আর প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে ক্লাস করছে শিক্ষার্থীরা।

Manual3 Ad Code

সহকারী শিক্ষক খুকুমণি রায় জানান, ‘প্রতিদিন আমরা আতঙ্কে থাকি কখন যে কী হয়! জরাজীর্ণ ভবনে ক্লাস নিতে হচ্ছে আমাদের। শিক্ষার্থীরা মেঝেতে বসে ক্লাস করছে, বসার জন্য বেঞ্চ নেই। প্রতিদিন কোনো না কোনো দুর্ঘটনা ঘটছে।’

সহকারী শিক্ষক বিউটি আক্তার বলেন, ‘এই বিদ্যালয় ভবনের অবস্থা খুবই খারাপ। যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাছাড়া নেই পর্যাপ্ত ওয়াশ ব্লক। ছাত্রছাত্রীসহ শিক্ষকরা একই টয়লেট ব্যবহার করি, এতে স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কা রয়েছে। এ ব্যাপারে আমরা দ্রুত নতুন ভবনসহ এর সমাধান চাই।’

অভিভাবক রুমা আক্তার জানান, ‘এই স্কুলের ভবনের অবস্থা অনেক খারাপ। আমরা বাচ্চাদের স্কুলে পাঠানোর পর ভয়ে থাকি কখন যে কী হয়। তাছাড়া স্কুলের মাঠের অবস্থাও অনেক খারাপ, খেলাধুলার জন্য অনুপযোগী। নেই কোনো খেলার সামগ্রী।’

Manual1 Ad Code

আরেক অভিভাবক সামসুন নাহার জানান, ‘বাড়ির পাশে স্কুল, তাই বাচ্চাকে এখানে পাঠাই। প্রায়ই কোনো না কোনো দুর্ঘটনা ঘটে। আমরা চাই এখানে নতুন ভবন নির্মাণ করা হোক। নতুন স্কুল ভবন হলে স্কুলের পরিবেশ ভালো হবে, পড়াশোনার মানও বাড়বে।শিক্ষার্থী মিনহাজ রহমান জানায়, ‘বর্ষার সময় আমাদের অনেক সমস্যা হয়। ছাদ দিয়ে পানি পড়ে ক্লাস করতে পারি না। অনেক সময় মাথায় সিমেন্ট খসে পড়ে, আমরা অনেক ভয়ে থাকি।’

৫ম শ্রেণির শিক্ষার্থী আয়েশা সিদ্দিকা জানায়, ‘এখানকার পানিতে অনেক গন্ধ। খাওয়ার জন্য মানুষের বাড়ি থেকে পানি নিয়ে এসে আমাদের খেতে হয়। তাছাড়া আমাদের আলাদা টয়লেট নেই। দুটি টয়লেট আমরা সবাই ব্যবহার করি। শিক্ষকরাও এটি ব্যবহার করেন। এতে অনেক সমস্যা হয়।’

স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল গফুর বলেন, ‘এই স্কুলটি আমাদের এলাকার পুরোনো একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে কোনো ধরনের সংস্কার না হওয়ায় ভবনটি এখন মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন এখানে ছোট ছোট শিশুরা ঝুঁকি নিয়ে পড়াশোনা করছে।’

Manual3 Ad Code

স্থানীয় আরেক বাসিন্দা ইউসুফ আলী বলেন, ‘স্কুল ভবনের অবস্থা দেখলে মনে হয় যেকোনো সময় ধসে পড়বে। বর্ষাকালে ছাদ দিয়ে পানি পড়ে, দেয়াল ভিজে যায়। আমরা এলাকাবাসী বহুবার সংশ্লিষ্ট দফতরে জানালেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।’

Manual6 Ad Code

প্রধান শিক্ষক মোছা. নাসরিন বেগম বলেন, ‘দুর্ঘটনা এড়াতে ক্লাস চলাকালীন আমরা একজন শিক্ষক পাঠদান করাই, আর আরেকজন শিক্ষক দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকি। কারণ, যদি কোনো বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে, তাহলে যেন দ্রুত শিক্ষার্থীদের ক্লাসরুম থেকে বের করতে পারি। অনেকবার নতুন ভবনের জন্য চিঠি দিয়েছি, কোনো কাজ হয়নি।’

সহকারী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. রবিউল ইসলাম বলেন, ‘নতুন ভবন নির্মাণের বিষয়ে এখনো উপজেলা শিক্ষা অফিস থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক চাহিদা পাওয়া যায়নি। উপজেলা শিক্ষা অফিসারের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় চাহিদাপত্র পাওয়া গেলে বিষয়টি যাচাই করে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।