২৮শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১৩ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ১৪ই সফর, ১৪৪৮ হিজরি

পাপিয়ার কললিস্টে ১১ মন্ত্রী ৩৩ এমপি মোবাইল নাম্বার পাওয়া গেছে

admin
প্রকাশিত ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০২০
পাপিয়ার কললিস্টে ১১ মন্ত্রী ৩৩ এমপি মোবাইল নাম্বার পাওয়া গেছে

Manual7 Ad Code

মনির সরকার, বিশেষ প্রতিনিধি :

বহুল আলোচিত নরসিংদী জেলা যুব মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদক শামিমা নূর পাপিয়াকে গত শনিবার (২২ ফেব্রুয়ারি) র‌্যাব বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার করে।

 

গত সোমবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) তাকে আদালতে তোলা হলে তার ১৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়েছে। আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সূত্রে জানা গেছে যে, গ্রেপ্তারের পর পাপিয়ার মোবাইল ফোনগুলো জব্দ করেছে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা।

 

এই মোবাইল ফোনগুলোতে পাপিয়ার অনেক ভিআইপির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের তথ্য পেয়েছে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে যে, পাপিয়ার মোবাইলে ১১ মন্ত্রীর মোবাইল নাম্বার পাওয়া গেছে। এই মোবাইল নাম্বারে পাপিয়া গ্রেপ্তার হওয়ার আগের দিন পর্যন্ত বিভিন্ন প্রভাবশালী মন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন।

 

এছাড়াও পাপিয়ার মোবাইলে ৩৩ এমপির তালিকা পাওয়া গেছে। এই ৩৩ এমপির সঙ্গে পাপিয়া নিয়মিত যোগাযোগ করতো। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে,গত শনিবার (২২ ফেব্রুয়ারি) যখন তাকে বিমানবন্দরে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা (র‌্যাব) আটক করে তখনও পাপিয়া তাদেরকে হুমকি ধামকি দিয়েছিলেন, তাদেরকে দেখে নেওয়ার জন্যও শাসিয়েছিলেন। তাদেরকে এটাও বলেছিলেন, আমি কে তোরা জানিস ?

Manual1 Ad Code

 

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, র‌্যাবের অমনমনীয় দৃঢ়তার মুখে শেষ পর্যন্ত পাপিয়া নমনীয় হন এবং তারপর তিনি তার অপরাধগুলো স্বীকার করতে থাকেন। আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা বলছে, এই কল লিস্ট মোবাইল অপারেটরদের কাছ থেকে আনা হয়েছে। এই ১৫ দিনের রিমান্ডে যাদের সঙ্গে তার যোগাযোগ, যাদের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলতেন, তাদের ব্যাপারে তথ্য বের করবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা।

Manual7 Ad Code

 

ইন্টারমেডিয়েট প্রথম বর্ষ থেকে অপকর্ম শুরু পাপিয়ার

 

গত শনিবার (২২ ফেব্রুয়ারি) পাপিয়া ও তা স্বামী মফিজুর রহমান ওরফে সুমন চৌধুরী, সাব্বির আহমেদ ও শেখ তায়্যিবাকে অর্থপাচার ও জাল মুদ্রা রাখার অভিযোগে আটক করে র‌্যাব। পরে তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালিয়ে বিদেশি মদ, পিস্তল, গুলি ও প্রায় ৬০ লাখ টাকা উদ্ধার করে। এ ঘটনায় তাদের বিরুদ্ধে বিমানবন্দর ও শেরেবাংলা নগর থানায় আলাদা তিনটি মামলা হয়। বিমানবন্দর থানার মামলায় পাপিয়াসহ চারজনকে ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে পাঠালে ৭ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে।

 

২০০৬ সালে নরসিংদী কলেজে ইন্টারমেডিয়েট প্রথম বর্ষে পড়ার সময় মফিজুর রহমান ওরফে সুমন চৌধুরীর সঙ্গে পাপিয়ার পরিচয় হয়। এরপর সেই সম্পর্ক প্রেমে রূপ নেয়। তখন থেকেই পাপিয়া অপকর্ম শুরু করে। এর তিন বছর পর ২০০৯ সালে তারা বিয়ে করেন। ২০১০ সালে বিবাহিত অবস্থায় নরসিংদী পৌর ছাত্রলীগের পদ পান পান।

 

এরপর শুধুই এগিয়ে যাওয়া তাদের। গড়ে তোলেন নিজস্ব ক্যাডারবাহিনী ‘কিউ অ্যান্ড সি’। এই ক্যাডার বাহিনীর প্রত্যেক সদস্যের হাতে ও পিঠে ট্যাটু আঁকা আছে। বিয়ের সময় তেমন কিছু না থাকলেও গত ১০ বছরের ব্যবধানে গড়েছেন অঢেল সম্পদ। যার বেশির ভাগই ২০১৮ ও ২০১৯ সালে অবৈধভাবে অর্জন করেছেন।

 

Manual8 Ad Code

আওয়ামী লীগে ‘করোনা ভাইরাস’ !

 

কামিনী, কাঞ্চনের সাথে নেশার আয়োজন যে খুব প্রভাবশালী তা এই উপমহাদেশের ইতিহাস দেখলেই পাওয়া যায়, এই বাংলা তো তার বাইরে না। তাই কামিনী দিয়ে কাঞ্চন এনে তার প্রবাহ ঠিক রাখতে বা বাড়াতে এর সাথে নেশার যোগান দেওয়া হয়। হালের অবস্থা দেখে মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে যে, যারা বাংলাদেশের গোটা রাজনীতিকে নিজের কব্জায় বন্দি করেছে তাঁদের আছে শত শত কামিনী। নজরুলের গানের ভাষায়, ‘পিয়া গেছে কবে পরদেশ পিউ কাহা ডাকে পাপিয়া’। ঘরে বৌ রেখেই উনারা ছুটে যান পাপিয়াদের কাছে। তাই তো বাংলার শহরে বন্দরে এখন পাপিয়াদের মহা-দাপট।

 

যাদের টাকা নেই তারা হয় সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজি বা চুরি করে না হয় আদিম ব্যবসার সাথে জড়িত হয়েই মূলধন তৈরি করে। এর প্রমাণ ভুরি ভুরি। আর এক শ্রেণির পুরুষ মানুষের হাতে যখন অসৎ পয়সা আসে সে তখন নিজেকে সম্রাট মনে করে। তাঁরা যায় পাপিয়াদের কাছে, কারণ তারা প্রতিদিন নতুন নতুন পাপিয়ার জন্ম দেয় টাকার লোভ দেখিয়ে বা অন্য বিপদে ফেলে। আর দেশের বিভিন্ন খাতে যারা সম্রাট, তারা সম্রাট হলেই সে নতুন নতুন হেরেমখানা খুঁজে ফেরেন। অতৃপ্তি তাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় ‘বেদি থেকে বেদিতে দিতে পূজার অর্ঘ্য’। তাই তারা সাহায্য নেয় ‘পাপিয়াদের মত দালালদের’।

 

টাকা বা কাঞ্চনের লোভ নাই, এমন মানুষ পাওয়া দুষ্কর। কিন্তু এমন মানুষ প্রায়ই দেখা যায় যে টাকা হলেই তারা সুরা আর সাকীতে আসক্ত হয়ে পড়েন। সুরা আর সাকী এমন নেশার দ্রব্য যাতে কেউ কোন দিন তৃপ্ত হয় না। তাই সুবিধাবাদীরা ক্ষমতাধর সুরা আর সাকী আসক্তদের কাজে লাগিয়ে টাকা আয় করে। অনেকে মন্তব্য করেন যে, জাতীয় পার্টির এক মহা ক্ষমতাধর ব্যক্তির সাকীর আসক্তি পার্টির পতনের অন্যতম কারণ। যারা জাতীয় পার্টির শাসনামল দেখেছে, তারা এই কথার সত্যতা উপলব্ধি করতে পারবেন। জাতীয় পার্টির এক বড় নেতার কত সেট গয়না ছিল জাতীয় সংসদে! যা নিয়ে তখনকার দিনে পত্রিকায় খবর বেরুতো।

 

Manual3 Ad Code

বিএনপির শাসনামলে সুরা আর সাকীতে আসক্ত এক যুবক প্রধানমন্ত্রীর প্রায় সমান ক্ষমতাধর ছিলেন। সেই ক্ষমতাধর যুবকের কাছ থেকে অনৈতিক আর্থিক সুবিধা নিতে সুবিধাবাদীরা সারা দেশের বিভিন্ন এলাকায় সেই যুবকের জন্য বালাখানা তৈরি করে। যারা ঐ যুবকের সঙ্গী ছিলেন তারা হয়ে পড়েন অপ্রতিরোধ্য। লুটপাটে মেতে উঠলেও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কিছুই করতে পারেন নি বা করেন নি। ফলাফল পতন, মহা পতন।

 

মতিয়া চৌধুরী, সাহারা খাতুন ও মুন্নুজান সুফিয়ানদের মতো নেত্রী তৈরির আশায় পাপিয়াদের দলে নেওয়া হলেও তারা ক্যাসিনো সেলিমদের সহযোগী হয়ে উঠেছে টাকার মোহে, ক্ষমতার মোহে। পাপিয়াদের মতো মনোরঞ্জনকারীদের যদি আওয়ামী লীগ, তার অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন থেকে ছেঁটে ফেলা না হয় তা হলে ভবিষ্যৎ যে খুব অন্ধকার তা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাস থেকেই জানা যায়। মানুষ যেভাবে জাতীয় পার্টি বা বিএনপি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, একইভাবে তারা আওয়ামী লীগের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে না তার গ্যারান্টি কই। আমাদের মনে রাখতে হবে যে আওয়ামী লীগের ত্যাগী কর্মী সমর্থকরাও অনেকে কিন্তু এবার নগরীর মেয়র নির্বাচনে ভোট দিতে যান নি। এত এত উন্নয়নের পরেও এটা আওয়ামী লীগের জন্য একটা বিশেষ সতর্ক বার্তা।

 

এদিকে গত রোববার (২৩ ফেব্রুয়ারি) মির্জা ফখরুল বলেছেন, ‘গণতন্ত্রের যিনি মাতা, তাঁকে কারাগারে আটক করে রাখা হয়েছে।’

 

তিনি মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচার-বিরোধী আন্দোলনসহ বিভিন্ন সময়ে খালেদা জিয়ার নানা ভূমিকার কথা স্মরণ করে বলেন, ‘স্বাধীনতার ৪৮ বছর পরে গণতন্ত্র ও গণতন্ত্রের মায়ের জন্য আমাদের এখানে দাঁড়াতে হয়। এ লজ্জা রাখার জায়গা নেই আমাদের। দেশনেত্রী শুধু একজন নেতা নন। তিনি

 

এই বাংলাদেশের সত্যিকার অর্থেই গণতন্ত্রের মাতা।’ এর পরে লাইনে উনি যা বলতে গিয়েও বলতে পারেন নি তা হলো, ‘গণতন্ত্রের পিতার ছেলে আজ নির্বাসিত। তিনি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন, ‘তাঁদের আমলের মত করে পাপিয়াদের ব্যাপক বিস্তার হউক। নেশায় বুদ হয়ে ফুর্তিতে মেতে উঠুক বড় বড় আমলা, রাজনীতিক, ব্যবসায়ী সবাই।

 

‘করোনা ভাইরাস’এর মত পাপিয়া ভাইরাস আওয়ামী লীগের তৃনমূলে থাকা মূল দল, তার অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন ছড়িয়ে পড়ুক। যাতে করে বাংলার মানুষের মনে ভালো মন্দের বিচারের কোন সুযোগ না থাকে। বলতে না পারে যে, অমুক ভালো আর অমুক খারাপ।