বিশেষ প্রতিনিধি।
গিরীন চক্রবর্তী বাঙালি লোকসঙ্গীত শিল্পী, নজরুলসঙ্গীত শিল্পী, সুরকার ও সঙ্গীত গবেষক। অজস্র কালজয়ী বাংলাগান বিশেষ করে লোকসঙ্গীতের অমর স্রষ্টা ছিলেন তিনি। জন্ম ৫ মে ১৯১৮ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সরাইলের কালিকচ্ছ গ্রামে। পিতা গৌরাঙ্গসুন্দর চক্রবর্তী ও মাতা ব্রজসুন্দরী দেবী। শৈশব থেকেই গিরীনের সংগীতের প্রতি আকর্ষণ ছিল। ব্রাহ্মণবাড়িয়ারই সন্তান সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর সান্নিধ্যে এসে তাঁর কাছেই শুরু হয় গিরীনের সঙ্গীতশিক্ষা। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের পাশাপাশি লোকসঙ্গীতের প্রতিও ছিল তাঁর প্রবল আগ্রহ। পরবর্তীতে তালিম নেন লোকসঙ্গীত শিল্পী ফকির আফতাবউদ্দিন খানের কাছে। ১৯৩০ এর দশকের কলকাতায় গিরীন চক্রবর্তী, আব্বাসউদ্দীন আহমদ, শচীন দেববর্মণ প্রমুখেরা জনপ্রিয় বাংলাগানের জগত ভাটিয়ালী ও ভাওয়াইয়া সংগীতের সুরে সমৃদ্ধ করেন। কাজী নজরুল ইসলামের অত্যন্ত স্নেহভাজন ছিলেন গিরীন চক্রবর্তী। নজরুল ইসলামের কারার ওই লৌহকপাট গানটি তিনি ১৯৪৯ সালে প্রথম রেকর্ড করেন। ‘এই শিকল পরা ছল’সহ নজরুল ইসলামের প্রায় ৩০টি গানের সুরারোপ করেছেন তিনি। কবির বিদ্রোহী কবিতা ‘বল বীর বল উন্নত মম শির’ তাঁর দেওয়া গীতিরূপে সার্থক গণসঙ্গীত হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। তাঁর কাছে তালিম নিয়ে যাঁরা খ্যাতি অর্জন করেছেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিবর্গ হলেন আব্বাসউদ্দীন আহমদ, চিত্ত রায়, ভবানীচরণ দাস, চিন্ময় লাহিড়ী, আঙুরবালা দেবী, ইন্দুমতী দেবী, কমলা ঝরিয়া, শৈল দেবী, হরিমতি দেবী, রাধারাণী দেবী, যূথিকা রায়, বাঁশরী লাহিড়ী, শচীন দেববর্মণ, তালাত মাহমুদ, অসিতবরণ, সত্য চৌধুরী, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, হেমন্ত মুখোপাধ্যায় প্রমুখ। সঙ্গীত শিল্পী তালাত মাহমুদের কণ্ঠে গিরীন চক্রবর্তীর রচিত ও কমল দাশগুপ্ত সুরারোপিত গান ‘দুটি পাখি দুটি তীরে মাঝে নদী বহে ধীরে’ ১৯৪০ এর দশকে বাংলা গানের জগতে সুপার হিট হয় এবং গজল গায়ক তালাত মাহমুদ বিশেষ পরিচিতি পান। গিরীন চক্রবর্তীকেই তাঁর আবিস্কারক হিসাবে গণ্য করা হয়। তাঁর বিখ্যাত কিছু গান হলো – নাও ছাড়িয়া দে পাল উড়াইয়া দে, কিশোরগঞ্জে মাসির বাড়ি, শিয়ালদহ গোয়ালন্দ আজও আছে ভাই প্রভৃতি। ‘আল্লা মেঘ দে পানি দে’ গানটি জালালউদ্দিন নামে এক গ্রামীণ লোকশিল্পী রচিত লোকগানের প্রথম চার পঙক্তি সংগ্রহের পর বাকি অংশটা তিনি রচনা করেন। গিরীন চক্রবর্তী কলকাতার বেঙ্গল মিউজিক কলেজ, বাসন্তী বিদ্যাবীথি ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। তিনি সেখানকার সিলেবাস কমিটির সদস্য ও পরীক্ষার প্রশ্নকর্তা ছিলেন। বাংলা লোকগানের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব গিরীন চক্রবর্তীর অকাল মৃত্যু ঘটে ১৯৬৫ সালের ২২ ডিসেম্বর কলকাতায়। তাঁর সুযোগ্যা কন্যা সঙ্গীতশিল্পী ছন্দা চট্টোপাধ্যায়। শ্রদ্ধাঞ্জলি।