৯ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৫শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৬শে সফর, ১৪৪৮ হিজরি

নির্বাচনে ৪৫ ঋণখেলাপি আইনের সীমাবদ্ধতা, না কি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা?

admin
প্রকাশিত ফেব্রুয়ারি ১, ২০২৬
নির্বাচনে ৪৫ ঋণখেলাপি আইনের সীমাবদ্ধতা, না কি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা?

Manual8 Ad Code

লোকমান ফারুক, রংপুর

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ঋণখেলাপি প্রার্থীদের অংশগ্রহণ, আবারও নির্বাচন ব্যবস্থার একটি পুরোনো; কিন্তু অনিষ্পন্ন প্রশ্নকে সামনে এনেছে।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, শেষ পর্যন্ত ৪৫ জন ঋণখেলাপি প্রার্থী এবারের নির্বাচনে বৈধতা পেয়েছেন। যদিও প্রাথমিক পর্যায়ে মাঠ প্রশাসন ঋণখেলাপির দায়ে ৮২ জনের মনোনয়ন বাতিল করেছিল।

এই নাটকীয় হ্রাস কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ফল নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আদালতের স্থগিতাদেশ, নির্বাচন কমিশনের ব্যাখ্যাগত অবস্থান এবং আইনের প্রয়োগে দীর্ঘদিনের অস্পষ্টতা।

প্রশ্ন উঠছে-এটি কি কেবল আইনের মারপ্যাঁচ, নাকি ক্ষমতাবানদের জন্য আইনের শিথিল প্রয়োগ?

আইন কী বলে, বাস্তবতা কী দেখায়

প্রচলিত নির্বাচনী আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি ঋণখেলাপি হিসেবে ঘোষিত হন, তবে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচনের অযোগ্য। কিন্তু বাস্তবে এই অযোগ্যতা কার্যকর হয়, কয়েকটি শর্তের ওপর-ঋণ পুনঃতফসিল হয়েছে কি না, আংশিক পরিশোধ হয়েছে কি না, অথবা আদালত কোনো স্থগিতাদেশ দিয়েছেন কি না।

Manual8 Ad Code

আইনে ‘ঋণখেলাপি’ শব্দটির সংজ্ঞা থাকলেও, স্থগিতাদেশপ্রাপ্ত ঋণখেলাপি প্রার্থীদের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের এখতিয়ার কতটুকু-তা স্পষ্ট নয়। এই অস্পষ্টতাকেই রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী প্রার্থীরা কাজে লাগাচ্ছেন বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।

নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা: ক্ষমতা প্রয়োগ, না ক্ষমতা এড়িয়ে যাওয়া

নির্বাচন কমিশনের অবস্থান বরাবরের মতোই সতর্ক।
কমিশনের যুক্তি-আদালতের স্থগিতাদেশ থাকলে তারা মনোনয়ন বাতিল করতে পারেন না। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের একাধিক আইনজীবী বলছেন, স্থগিতাদেশ মানেই কাউকে ঋণখেলাপির দায় থেকে মুক্ত করা নয়।
সহকারী এটর্নি জেনারেল মোস্তাফিজুর রহমান মুকুলের ভাষায়, “স্টে অর্ডার একটি সাময়িক সুরক্ষা। এতে কেউ ব্যাংকরাপ্ট থেকে বের হয়ে যায় না। নির্বাচন কমিশনের এখতিয়ার আছে যাচাই করার।

অর্থাৎ, কমিশন চাইলে আইন ব্যাখ্যার মধ্য দিয়েই কঠোর অবস্থান নিতে পারত। কিন্তু বাস্তবে কমিশন সেই ক্ষমতা প্রয়োগে অনাগ্রহী-এমন অভিযোগ নতুন নয়।

আদালতের ‘ইকুইটি’ ও তার অপব্যবহার

উচ্চ আদালত অনেক ক্ষেত্রে ‘ইকুইটি’ বা ন্যায্যতার যুক্তিতে ঋণখেলাপিদের আংশিক সুযোগ দিয়ে থাকেন। সাধারণত শর্ত থাকে-১০ শতাংশ অর্থ পরিশোধ বা সদিচ্ছার প্রমাণ। এই ব্যবস্থার উদ্দেশ্য ছিল অনিচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের সুরক্ষা দেওয়া।

কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, এই সুযোগই এখন ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের প্রধান আশ্রয়স্থল। সহকারী এটর্নি জেনারেলের ভাষায়, “এটাকেই অনেকে মিস-ইউজ করে।

প্রশ্ন হলো—যে ব্যক্তি বছরের পর বছর হাজার কোটি- টাকা পরিশোধ করেননি, তার ক্ষেত্রে এই ‘সদিচ্ছা’ কতটা গ্রহণযোগ্য?

রাজনৈতিক দলভিত্তিক চিত্র: দায় কার?

Manual7 Ad Code

ঋণখেলাপি প্রার্থীদের তালিকা পর্যালোচনায় দেখা যায়
বিএনপির ১৪ জন, জামায়াত ইসলামীর ১ জন (আরেকজন পরিশোধ করে বৈধ), নাগরিক ঐক্যের প্রার্থী মাহমুদুর রহমান মান্না(তিনিও বর্তমানে বৈধ), জাতীয় পার্টি, ইসলামী আন্দোলন ও বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টির ১ জন করে।

Manual5 Ad Code

আর স্বতন্ত্র প্রার্থী ১১ জন।‌এটি স্পষ্ট করে যে, ঋণখেলাপি প্রার্থী কেবল একটি দলের সমস্যা নয়; বরং এটি পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থার একটি কাঠামোগত সংকট। দলগুলো মনোনয়ন দেওয়ার সময় ঋণখেলাপির বিষয়টি উপেক্ষা করছে, আবার পরে আইনি সুবিধা কাজে লাগিয়ে প্রার্থীদের রক্ষা করছে।

অর্থনীতি ও জনস্বার্থের প্রশ্ন

অর্থনীতিবিদরা বিষয়টি দেখছেন আর্থিক শৃঙ্খলার দৃষ্টিকোণ থেকে। সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমানের মতে,”ব্যাংক, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং আদালতের ভূমিকা এখানে একে অপরের সঙ্গে জড়িত।

কিন্তু এর পরিণতি ভোগ করছে সাধারণ মানুষ।
যেখানে সাধারণ আমানতকারী ব্যাংক থেকে নিজের টাকা তুলতে হিমশিম খাচ্ছেন। সেখানে হাজার কোটি টাকা বকেয়া রেখেও কেউ সংসদ সদস্য হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। এটি ব্যাংকিং শৃঙ্খলা ও নৈতিকতার ওপর সরাসরি আঘাত।

কাঠামোগত ব্যর্থতা না রাজনৈতিক সমঝোতা?

Manual2 Ad Code

এই পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে তিনটি বিষয় স্পষ্ট হয়-
আইন স্পষ্ট হলেও তার প্রয়োগ দুর্বল, নির্বাচন কমিশন সক্রিয় ভূমিকা নিতে অনাগ্রহী; রাজনৈতিক দলগুলো নৈতিক মানদণ্ড মানতে ব্যর্থ। ফলে ঋণখেলাপি প্রার্থীদের প্রশ্নটি আর ব্যক্তিগত অপরাধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার প্রতীক।

শেষ বিশ্লেষণ

আইন কি সত্যিই নির্বাচন কমিশনের হাত বেঁধে রেখেছে,
নাকি ক্ষমতাবানদের ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগে এক ধরনের নীরব সমঝোতা তৈরি হয়েছে। এই প্রশ্নের উত্তর এখনো অস্পষ্ট। তবে স্পষ্ট একটি বাস্তবতা হলো-এই ব্যবস্থায় লাভবান হচ্ছেন ঋণখেলাপিরা, আর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ব্যাংকের আমানতকারী ও গণতন্ত্রের নৈতিক ভিত্তি।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন থেকেই যায়-ঋণখেলাপি হয়েও জনপ্রতিনিধি হওয়ার সুযোগ যদি থেকেই যায়, তাহলে আইনের প্রতিরোধমূলক শক্তি কোথায়?