৯ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৫শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৬শে সফর, ১৪৪৮ হিজরি

কুঁড়েঘরে বৃদ্ধ দম্পতির মানবেতর জীবন

প্রকাশিত মার্চ ১৭, ২০২৩
কুঁড়েঘরে বৃদ্ধ দম্পতির মানবেতর জীবন

Manual8 Ad Code

সাকিব আলম মামুন

লংগদু, রাঙামাটি

শেষ বয়সে তাদের দেখার কেউই নেই। মাথা গোঁজার ঠিকানা ছোট একটি কুঁড়েঘর। সেটিতেও হাঁস মুরগির বিষ্ঠা ও বর্জ্যের দুর্গন্ধ। তবুও নিরুপায় হয়ে সেখানেই বাস করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। হাঁড় কাঁপানো শীতেও স্যাঁতসেঁতে মেঝেতে বিছানো একটি শীতল পাটিই ছিলো তাদের বিছানা। রোগা শরীর নিয়ে কোনো মতে একবেলা রান্না করে খান পরবর্তী কয়েক বেলা। প্রায় বেলাতেই কপালে জোটে পান্তা ভাত আর পোড়া মরিচ। কখনো দিন পার করেন না খেয়ে। মানবেতর জীবনযাপনের এই গল্প শতবর্ষী বৃদ্ধা আব্দুল কাদের ও তার সত্তোরোর্ধ স্ত্রীর।

Manual8 Ad Code

বৃদ্ধ দম্পতিটি রাঙামাটির লংগদু উপজেলার গুলশাখালী ইউনিয়নের পূর্ব জালালাবাদ গ্রামে বসবাস করেন। কিন্তু সেখানে তাদের ভিটে-বাড়ি তেমন কিছুই নেই। নিকটাত্মীয় বলতেও নেই তেমন কেউ। আছে শুধু শারীরিক ও বুদ্ধি প্রতিবন্ধী দুই ছেলে, দুই মেয়ে। ছোট ছেলেটা তাদের সাথে থাকলেও অন্যদের কোনো খোঁজ খবর নেই।

Manual5 Ad Code

দারিদ্র্যতা ও অসহায়ত্বের কারণে সেই ছেলেমেয়েদের চিকিৎসা করানো সম্ভব হয়ে উঠেনি। বয়সের ভারে হাটা-চলা তাদের পক্ষে কষ্টসাধ্য। স্ত্রীর বয়স্ক ভাতার অর্থ দিয়েই কোনোমতে চলে তিন সদস্যের এই পরিবার। পেটের তাগিদে লাঠি ভর দিয়ে মানুষের দ্বারে দ্বারে যেতে হয় তাদের। এলাকার মানুষদের কাছে হাত পেতে যা পায়, তা দিয়েই চালান সংসার।

সরেজমিনে গিয়ে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। দেখা গেছে, পূর্ব জালালাবাদ গ্রামে আট-দশ হাত দৈর্ঘ্য আর পাঁচ-ছয় হাত প্রস্থের একটি কুড়েঘরে বাস করছেন বৃদ্ধা দম্পতি। তবে কয়েকবছর আগে এলাকার কিছু লোকের সহযোগিতায় ছোট একটি এককক্ষ বিশিষ্ট দোচালা টিনের ঘর তুলে দিয়েছে সেই কুঁড়েঘরের সাথে। সেখানে এলোমেলো পুরনো কাপড়-চোপড়। এককোণে চুলা, আর চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা হাঁড়ি-পাতিল। এসব নিয়েই তাদের সংসার।

Manual4 Ad Code

কষ্টের জীবনের কথা জানতে চাইলে অশ্রুভেজা চোখে আব্দুল কাদের বলেন, ‘বাবারে খুব কষ্ট করি। এই শীতে কত কষ্ট কইরা রাইত কাটাইছি। বাতাসে গাও, আত-পাও ঠাণ্ডা ওইয়া যাইতো। থরথর কইর‌্যা কাঁপছি। এহন ঝড় তুফানের দিন আইতাছে আমার এই ঘরটা অল্প বাতাসেই ভাইঙ্গা যাইবো মনে হয়। অসুখবিসুখ লইয়া বাড়ি বাড়ি যাইতে পারি না। টাহার অভাবে ওষুধ কিনতে পারি না। ডাকলে কেউ আইয়ে না। বয়স তো কম অইলো না এহনো কোনো ভাতা পাইলাম না। ছেলেটা প্রতিবন্ধী তারও কোনো ভাতা দেয় নাই। সরকার নাকি ঘর দেয়, বারবার মেম্বার চেয়ারম্যানরে বইলাও একটা ঘর পাই নাই। টাকা ছাড়া ঘর পাওয়া যায় না। এই জীবন আর ভালো লাগে নারে বাবা।’

স্থানীয়রা জানায়, এই বৃদ্ধ দম্পতির ও তার অসুস্থ ছেলের মানবেতর জীবনযাপন দীর্ঘদিনের। তবুও স্থানীয় চেয়ারম্যান, মেম্বাররা কোনো প্রকার সহযোগিতা করছে না। তাদের থাকার মতো ঘর নেই, পানির ব্যবস্থা নেই, সৌর বিদ্যুতের ব্যবস্থা নেই। রাতের বেশির ভাগ সময়ই অন্ধকারে কাটান তারা। স্থানীদের দাবি, সরকারি ঘর, বয়স্ক ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, ভিজিডি কার্ড, সৌর বিদ্যুৎ ও একটি নল কূপের ব্যবস্থা করে তাদের শেষ বয়সে দুঃখ মোচন করা হোক।

Manual5 Ad Code

ইউপি চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম বলেন, বৃদ্ধা দম্পতির মানবেতর জীবনযাপনের বিষয়টি আমি অবগত আছি। সামনে সরকারি ঘর সহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধা তাদের দেওয়া হবে।

এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আকিব ওসমান বলেন, ইতিমধ্যেই বিষয়টি অবহিত হয়েছি। উপজেলা প্রশাসন থেকে, খোঁজ খবর নিয়ে ওই বৃদ্ধ দম্পতির ও তার অসুস্থ ছেলেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে। আমি সে অনুযায়ী পরিকল্পনা করছি।