সরকারি দপ্তরে হয়রানিমুক্ত সেবা নিশ্চিত করার আহ্বান আখতারের
লোকমান ফারুক, রংপুরঃ নির্বাচনের পর প্রথম আনুষ্ঠানিক সফরে এসে সরকারি দপ্তরগুলোর ভেতরের অদৃশ্য দেয়ালের দিকে আঙুল তুললেন আখতার হোসেন। তার ভাষায়, “কোনো ফাইল অযথা আটকে রাখা যাবে না।” কথা ছিল সংক্ষিপ্ত, কিন্তু ইঙ্গিত দীর্ঘ—রাষ্ট্রের সেবাদান প্রক্রিয়ার ধীরগতি আর হয়রানির সংস্কৃতির দিকে।
সোমবার দুপুরে পীরগাছা উপজেলা পরিষদ মিলনায়তন-এ উপজেলা প্রশাসনের আয়োজিত পরিচিতি ও মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন। ইউপি চেয়ারম্যান, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, জুলাই আন্দোলনের যোদ্ধা ও শহিদ পরিবারের সদস্য এবং স্থানীয় সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন। নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য হিসেবে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে এটিই ছিল তার প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক। তিনি বলেন, সরকারি অফিসে সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে “ইতিবাচক প্রতিযোগিতা” গড়ে তুলতে হবে। কোন দপ্তর কত দ্রুত সেবা দিতে পারে—সেটিই হোক মূল্যায়নের মাপকাঠি। তার কথায়, সরকারি চাকরি কোনো বিশেষাধিকার নয়; এটি জনগণের কাছে দায়বদ্ধতার চুক্তি।
গ্রামের মানুষের কথা টেনে তিনি বলেন, অনেকেই সরকারি দপ্তরে এসে ভীত ও সংকুচিত বোধ করেন। নিয়ম জানেন না, কক্ষের দরজা কোথায় খুলবে তাও স্পষ্ট নয়। “এ অবস্থায় কর্মকর্তাদের সহিষ্ণু হতে হবে,” তিনি যোগ করেন। আগে আসা ব্যক্তি আগে সেবা পাবেন—এই নীতি অনুসরণের ওপর জোর দেন তিনি। জরুরি বিষয় দ্রুত নিষ্পত্তির কথাও বলেন। থানায় গিয়ে যেন সাধারণ মানুষ অযথা জটিলতায় না পড়েন, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, তিনি বিরোধী দলের সংসদ সদস্য। দায়িত্ব পালনে চ্যালেঞ্জ থাকবে। তবে জনগণের সমর্থনই তার শক্তি—এমন মন্তব্য করেন তিনি। দল-মত নির্বিশেষে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দেন।
সভায় জুলাই আন্দোলনে আহত ও শহিদ পরিবারের সদস্যদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান আখতার। তাদের আত্মত্যাগের প্রসঙ্গ তুলে বলেন, রাজনৈতিক পরিবর্তন হঠাৎ আসে না; এর পেছনে থাকে রক্ত, ধৈর্য ও দীর্ঘ প্রতীক্ষা। পরে তাদের মধ্যে রমজান উপলক্ষে শুকনো খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়।
সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, গণতন্ত্রে জবাবদিহিতার ভিত্তি হলো স্বাধীন ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা। গণমাধ্যমকর্মীদের ন্যায্য সুযোগ-সুবিধার প্রশ্ন সংসদে তোলার আশ্বাস দেন।
পীরগাছা ও কাউনিয়ার উন্নয়ন প্রসঙ্গে তিনি তিস্তা নদীর কথা বলেন। নদী ভাঙন, পানি বণ্টন ও দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তার কথা উল্লেখ করে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। তিস্তা এখানে শুধু নদী নয়; অনেকের কাছে এটি ভাঙনের প্রতীক, আবার টিকে থাকারও।
সভায় সভাপতিত্ব করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দেবাশীষ বসাক। উপস্থিত ছিলেন উপজেলা জামায়াতের আমির বজলুর রশিদ মুকুল, পীরগাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা একেএম খন্দকার মুহিব্বুল ইসলাম, পীরগাছা প্রেস ক্লাবের নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা ও স্থানীয় প্রতিনিধিরা।
সভা শেষে আখতার হোসেন সদ্যপ্রয়াত জামায়াত নেতা ফারুক ইকবালের কবর জিয়ারত করেন। পরে চৌধুরাণী-ফতেপুরঘাট সড়কের উদ্বোধন এবং বিকেলে পীরগাছা সরকারি কলেজ মাঠে আয়োজিত গণসংবর্ধনা ও গণইফতার অনুষ্ঠানে অংশ নেন। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানানো হয়।
সরকারি দপ্তরে হয়রানিমুক্ত সেবা—এই আহ্বান নতুন নয়। প্রতিটি নির্বাচনের পরই এমন প্রতিশ্রুতি শোনা যায়। প্রশ্ন থেকে যায়, কথাগুলো কি নীতিতে রূপ নেবে, নাকি ফাইলের ভেতরেই আরেকটি নথি হয়ে থাকবে? রাষ্ট্রের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা সাধারণ মানুষ কি এবার সত্যিই ভরসা পাবে?