১৬ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২রা চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ২৭শে রমজান, ১৪৪৭ হিজরি

শ্রম পরিদর্শন না প্রহসন?

Editor
প্রকাশিত মার্চ ১৬, ২০২৬
শ্রম পরিদর্শন না প্রহসন?

Manual2 Ad Code

শ্রম পরিদর্শন না প্রহসন?

লোকমান ফারুকঃ ঈদের আগে শহরের আলো ধীরে ধীরে উজ্জ্বল হয়। রেস্তোরাঁর কাচের দরজায় প্রতিফলিত হয় ব্যস্ত শহর, অতিথিদের হাসি, ধোঁয়া ওঠা কাবাবের প্লেট। কিন্তু সেই আলোয় একটি বৈপরীত্য লুকিয়ে থাকে। বৈপরীত্য- হল রুমের টেবিলে প্রাচুর্য, আর পেছনের রান্নাঘরে বোনাস পাওয়ার অনিশ্চয়তা। অধিকার আছে, আইন আছে, পরিদর্শন আছে—তবু কেন হোটেল-রেস্তোরাঁ শ্রমিকের ঈদ বোনাস আজও প্রশ্নবোধক চিহ্ন? এই প্রশ্নের ভেতরেই লুকিয়ে আছে আমাদের শ্রম প্রশাসনের এক নীরব গল্প; এমন এক গল্প, যা কখনো কখনো স্মরণ করিয়ে দেয় কোন কেলেঙ্কারির অনুসন্ধানী পাঠ—সত্য প্রায়ই শুরু হয় ছোট একটি অসঙ্গতি থেকে।

Manual6 Ad Code

ভোর ছয়টা। শহরের আকাশ তখনও কুয়াশার ধূসরতায় ঢাকা। রংপুর শহরের একটি ব্যস্ত রেস্তোরাঁর রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে আছে বকুল—একজন ওয়েটার। তার দিন শুরু হয় অন্যদের ঘুমের ভেতর। শেষ হয়; শেষ অতিথিকে বিদায়ের  পর। নয়-দশ ঘণ্টা কাজ এখানে স্বাভাবিক, কখনো কখনো তারও বেশি। হিসাবের খাতায় ওভারটাইম নেই। মাসের শেষে বেতন হাতে এলে বাড়িতে টাকা পাঠাতে হয়। এবার মায়ের একটি ছোট অনুরোধ—“ঈদে বোন-দুলাভাই আসবে, কিছু ভালো-মন্দ করবি।” বকুল তখন মনে মনে হিসাব করে—বেতন দিয়ে চলা যায়, কিন্তু বাড়তি আনন্দের জন্য দরকার ঈদের বোনাস। সেই বোনাসই এখন অনিশ্চয়তার আরেক নাম।

আইনের ভাষা অবশ্য অন্য কথা বলে। শ্রম বিধিমালায় উৎসব ভাতা শ্রমিকের স্বীকৃত অধিকার। কাগজে লেখা আছে—শ্রম পরিদর্শক যেকোনো প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করতে পারবেন, রেকর্ড পরীক্ষা করতে পারবেন, আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করবেন। শব্দগুলো দৃঢ়। কিন্তু বাস্তবের মাটিতে এসে যেন সেই দৃঢ়তা নরম হয়ে যায়। আইন যেন অনেক সময় নদীর পাড়ে দাঁড়ানো বাঁধ—দেখতে শক্ত, কিন্তু ভেতরে ভেতরে ক্ষয় ধরেছে।

Manual6 Ad Code

রংপুর, রাজশাহী, পাবনা, বগুড়া, নাটোর, দিনাজপুর—বিভিন্ন জেলা শহরের হোটেল-রেস্তোরাঁ শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বললে একটি মিলিত সুর শোনা যায়। পূর্ণ বোনাস পাওয়া বিরল ঘটনা। অর্ধেক বোনাস সাধারণ। আর একেবারেই না পাওয়া—অস্বাভাবিক নয়। ঢাকার একটি বাণিজ্যিক এলাকার এক ওয়েটার বলেন, “পরিদর্শক আসার আগেই খবর আসে। আগে থেকেই বানানো রেজিস্টার ঠিক করা থাকে। আমরা কী বলব সেটাও বলে দেওয়া হয়।” তার কথার ভেতর এক ধরনের তিক্ত হাসি—যেন নাটকের মঞ্চে সংলাপ আগেই লেখা।

রাজশাহীর এক রাঁধুনি বলেন, “বোনাস চাইলে বলে—কাজ করতে চাইলে চুপ থাক।” কথাটি ছোট, কিন্তু তাতে লুকিয়ে আছে শ্রমবাজারের নীরব বাস্তবতা। কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তার ভেতর দাবি তোলা অনেক সময় ঝুঁকির নাম।

একজন সাবেক শ্রম পরিদর্শক, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, বললেন—“সব পরিদর্শক এক রকম নন। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে আগাম সমঝোতা থাকে। ফোন যায, রেজিস্টার প্রস্তুত থাকে। শ্রমিকদেরও বলা হয় কী বলতে হবে।” তার কথায় একটি শব্দ বারবার ফিরে আসে—“রুটিন।” তার ভাষায়, অনেক সময় রুটিন পরিদর্শন হয়ে ওঠে রুটিন মীমাংসা।

এই জায়গায় এসে প্রশ্নটি শুধু বোনাসের নয়; এটি হয়ে ওঠে প্রাতিষ্ঠানিক আচরণের প্রশ্ন। যদি পরিদর্শনের আগে খবর পৌঁছে যায়, তবে সেটি কি আর পরিদর্শন থাকে? নাকি সেটি হয়ে ওঠে আয়নার সামনে সাজানো দৃশ্য—যেখানে বাস্তবতাকে একটু আড়াল করা হয়?

অভিযোগ অনুযায়ী, কিছু অঞ্চলে বড় রেস্তোরাঁ মালিকদের সঙ্গে দায়িত্বশীল পরিদর্শকদের একটি বড় অংশের নীরব বোঝাপড়া রয়েছে। একে কেউ বলে ‘সমঝোতা’, কেউ বলে ‘ব্যবস্থাপনা’। এর অর্থনীতি সহজ। মালিক আইনি ঝুঁকি এড়ান। অসাধু কর্মকর্তা সুবিধা পান। আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা শ্রমিকের কণ্ঠস্বর হয়ে যায় ক্ষীণ! তবে কত শীর্ষ পর্যায় পর্যন্ত-এই অসাধু কর্মকর্তাদের নেটওয়ার্ক, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। লোকমুখে একটি প্রবাদ আছে—“গাছে কাঁঠাল, গোঁফে তেল।” এখানে যেন ঠিক তার উল্টো—ফল ঝরে পড়ার আগেই ভাগাভাগির হিসাব ঠিক হয়ে যায়।

কিছু ট্রেড ইউনিয়ন কর্মীও স্বীকার করেন, বাস্তবতা সব সময় লড়াইয়ের পক্ষে থাকে না। “সব জায়গায় আমরা শক্ত অবস্থানে নেই। অনেক মালিক প্রভাবশালী। অভিযোগ করলে চাকরি হারানোর ভয় থাকে।” বললেন, রাজশাহীর একজন ইউনিয়ন সংগঠক, তার কথায় ক্লান্তি আছে; আবার বাস্তবতার স্বীকারোক্তিও আছে। এই জটিল বাস্তবতার ভেতরে ইতিহাসেরও একটি আয়না আছে। উৎসব ভাতা ধারণাটি বাংলাদেশে নতুন নয়। ১৯৮০-এর দশকে সামরিক শাসক হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ-এর সময় এটি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়। প্রথমে অর্ধেক বোনাস, পরে পূর্ণ বোনাস—সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারী থেকে ধীরে-ধীরে এটি শ্রমিক অধিকারের অংশে পরিণত হয়। চার দশক পরে প্রশ্ন জাগে—এই অধিকার কি আবার অনুগ্রহে ফিরে যাচ্ছে? অবশ্য মালিকদের বক্তব্যও আছে।  “ব্যবসা আগের মতো নেই। খরচ বেড়েছে। সবাইকে ফুল বোনাস দেওয়া কঠিন।” বলেছেন রংপুরের একজন রেস্তোরাঁ মালিক। তার যুক্তি অর্থনৈতিক বাস্তবতার কথা বলে। কিন্তু এখানেই তৈরি হয় বৈপরীত্য—আইনের ভাষা ও বাজারের যুক্তির মাঝখানে শ্রমিক দাঁড়িয়ে থাকে এক অদ্ভুত সীমানায়।

Manual4 Ad Code

দুপুরের ব্যস্ত সময়ে রেস্তোরাঁর ভেতর দাঁড়ালে দৃশ্যটি অন্যরকম লাগে। গরম খাবারের গন্ধ ভেসে আসছে, অতিথিরা হাসছেন, টেবিলে থালা বদলাচ্ছে। বকুলের হাতে খাবারের প্লেট স্থির। অতিথির সামনে সে হাসে—যেন এটাই তার পেশাগত মুখ। কিন্তু বোনাসের কথা উঠতেই সেই হাসি একটু থেমে যায়। সে ধীরে বলে, “বোনাস না পেলে বাড়ি যেতে পারব না। গেলে টাকা লাগবে। না গেলে মা কাঁদবে।”

এই একটি বাক্যের ভেতর শ্রম আইনের অনেক অনুচ্ছেদ হঠাৎ খুব মানবিক হয়ে ওঠে।

ঈদের চাঁদ উঠবে। শহরের বড় রেস্তোরাঁয় আলো জ্বলবে। কাবাবের ধোঁয়া উঠবে, সেমাইয়ের বাটি ভরবে। অতিথিদের টেবিলে উৎসবের উচ্ছ্বাস থাকবে। কিন্তু পেছনে রান্নাঘরের  থালাবাসনের শব্দের ভেতর, বকুলের মতো শ্রমিকদের মনে একটি প্রশ্নই ঘুরবে—অধিকার কি সত্যিই অধিকার, নাকি কেবল একটি শব্দ?

Manual1 Ad Code

সমস্যার সমাধান সহজ নয়। কিন্তু প্রশ্নটি জরুরি। কারণ, আইন যদি প্রয়োগহীন হয়; তবে তা কাগজের ভাষা মাত্র। পরিদর্শন যদি বাস্তবের সঙ্গে না মেলে, তবে সেটি আস্থার সেতু নয়—প্রহসনের মঞ্চ। আর শ্রমিকের অধিকার যদি অনিশ্চিত থাকে, তবে উন্নয়নের গল্