১৭ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৪ঠা ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ২৯শে শাবান, ১৪৪৭ হিজরি

ভুয়া কাজী, ভুয়া লাইসেন্স, বৈধ বিয়ে – পর্ব ১

admin
প্রকাশিত ডিসেম্বর ২৭, ২০২৫
ভুয়া কাজী, ভুয়া লাইসেন্স, বৈধ বিয়ে – পর্ব ১

Manual1 Ad Code

লোকমান ফারুক, রংপুর

রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার ৯ নং ময়েনপুর ইউনিয়নের কদমতলী বাজারের পান দোকানটা আলাদা করে চোখে পড়ার কথা নয়। টিনের ছাউনি, কাঠের বেঞ্চ, পানপাতার গন্ধ—গ্রামবাংলার শত শত বাজারের মতোই।

কিন্তু এই দোকান থেকেই বেরিয়ে আসে এমন একটি নাম, যা রাষ্ট্রের খাতায় নেই, অথচ মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে হয়ে উঠে দৃশ্যমান।

নিজের পরিচয় গোপন রেখে শুধু বলা হয়েছিল- আখিরার হাটের পার্শ্বে একটি বিয়ে হবে, একজন ভালো কাজী দরকার। দোকানদার এক মুহূর্তও ভাবেননি।

বললেন, “এনামুল নামে একজন আছে। খুব ভালো কাজী। ডেকে দিই?” ফোন ধরিয়ে দেওয়া হলো। ওপাশে আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠ।

তিনি কোনো ভূমিকা না শুনেই বললেন—বিয়ে পড়ানো যাবে, রেজিস্ট্রিও হবে। শুধু শর্ত, “ছেলেমেয়ে নিয়ে আসতে হবে। আইনের ভাষায় এই কণ্ঠস্বরের কোনো অস্তিত্ব থাকার কথা নয়।

কারণ, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নথিতে মো. এনামুল হকের নাম নেই।

২০১৭ সালের ৮ মার্চ, মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে স্পষ্ট লেখা ছিল—মো. এনামুল হকের কোনো নিয়োগপত্র মন্ত্রণালয় থেকে ইস্যু করা হয়নি। এবং নির্দেশ ছিল তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করার।

এই চিঠি রাষ্ট্র লিখেছিল আট বছর আগে। এরপর কী হয়েছে—মামলা হয়নি। কাজ বন্ধ হয়নি।

বরং মাঠে নেমে দেখা যায়, ময়েনপুর ইউনিয়নে এনামুল হক পরিচিত নাম। বিয়ের কথায়, তালাকের কথায়—তার নামই আগে আসে।

প্রশ্ন ওঠে—একজন ভুয়া কাজী এতদিন কাজ করলেন কীভাবে? উত্তর খুঁজতে গেলে গল্প ঢুকে পড়ে ফাইলের ভেতর।

Manual1 Ad Code

জেলা রেজিস্টার কার্যালয় থেকে এনামুল হকের নামে ইস্যু হয়েছে সরকারি বিয়ে রেজিস্টার, তালাক রেজিস্টার, খোলা তালাক ও তালাক-ই-তফ-ই-উজের রেজিস্টার। এই রেজিস্টার ছাড়া কোনো কাজীর কাজ করার কথা নয়।

অর্থাৎ, যাকে মন্ত্রণালয় চেনে না—জেলা রেজিস্টার তাকে চেনে। এই বৈপরীত্যের মাঝখানেই ভেসে ওঠে আরেকটি নাম। রংপুর সিটি কর্পোরেশনের ২৬ নং ওয়ার্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত কাজী, জেলা কাজী সমিতির প্রভাবশালী সদস্য হাফিজ মো. আব্দুল কাদির।

তার স্বাক্ষরে কাজীগণের ‘চাহিদা মোতাবেক’ যে তালিকা জমা পড়ে, সেখানে এনামুল হকের নামও ছিল।
তালিকা জমা পড়ে। রেজিস্টার আসে। কাজ চলে।

Manual1 Ad Code

মাঠে সন্দেহ ছিল। ৯ নং ময়েনপুর ইউনিয়নের ২ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্যসহ কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছিলেন।

Manual7 Ad Code

স্বাক্ষরসহ অভিযোগও গিয়েছিল জেলা রেজিস্টারের কাছে। কিন্তু কিছুই হয়নি। একজন ইউপি সদস্য বললেন, “যেহেতু কিছু হয়নি, আমরা ধরে নিয়েছি উনি ঠিকই আছেন।” এই ‘ধরে নেওয়া’ই যেন ভুয়া লাইসেন্সের সবচেয়ে বড় অনুমোদন।

Manual8 Ad Code

পর্ব–১ এখানেই থেমে যায়। একটি প্রশ্ন জমে থাকে পাঠকের মাথায়—যদি এনামুল হক ভুয়া হন,
তাহলে তাঁর পড়ানো বিয়েগুলোর কী হবে?