বরিশালের ক্ষণজন্মা এক কীর্তিমান পুরুষকে স্মরণ।
বিশেষ প্রতিনিধিঃ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর কর্ণকুন্তি সংবাদ থেকে শুরু করে ফরাসি বিপ্লব, ভিয়েতনাম যুদ্ধ, রামায়ণ, মহাভারত ইতিহাস, সাহিত্য ও সভ্যতার অসংখ্য অধ্যায় ছিল তাঁর নিত্যপাঠ।
উইলিয়াম শেক্সপিয়ার, হোমার, জন কিটস, নেপোলিয়ন বোনাপার্ট বিশ্ববরেণ্য মনীষীদের জীবন ও কর্ম থেকেও তিনি আহরণ করতেন প্রজ্ঞা।
এই জ্ঞানগর্ভ চর্চা শুধু নিজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেননি তিনি তা সন্তানদের মাঝেও ছড়িয়ে দিতেন। তাঁর সন্তান আবুল খায়ের আব্দুল্লাহ একদিন প্রশ্ন করেছিলেন, “পঞ্চপাণ্ডব কেন পড়ছো?”
তিনি জবাব দিয়েছিলেন—
“এখান থেকে শেখা যায়—রাজনীতি, রাজ্য পরিচালনা, ধর্ম এবং কূটনীতি।”
এমন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন, মানবিক ও প্রজ্ঞাবান মানুষটি হলেন—
শহীদ আবদুর রব সেরনিয়াবাত
জন্ম: ১০ এপ্রিল ১৯২১ (২৭ চৈত্র ১৩২৭)
মৃত্যু: ১৫ আগস্ট ১৯৭৫
বিশাল মনের অসাম্প্রদায়িক এবং সংস্কৃতিমনা এই মানুষটি ১৯২১ সালের ১০ এপ্রিল বৃহত্তর বরিশাল জেলার গৌরনদী (বর্তমানে আগৈঝাড়া) উপজেলারসরাইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তারা ছিলেন দুই ভাই, এক বোন। তাঁর পিতার নাম আব্দুল খালেক সেরনিয়াবাত এবং মাতার নাম বেগম হুরুন্নেছা। তাঁর বাবা ছিলেন গৈলা ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট।
তিনি ভোলা হাইস্কুল থেকে প্রবেশিকা, বরিশাল বি.এম কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট (উচ্চ মাধ্যমিক) পাশ করেন। পরে তিনি উচ্চ শিক্ষা গ্রহনের জন্য পশ্চিম বাংলার কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হন। কলেজ জীবনে তিনি কলকাতার বেকার ছাত্রাবাসে বসবাস করতেন। কলেজ জীবন থেকেই তার সহপাঠি এবং বন্ধু ছিলেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেখানে তিনি ধর্ম নিরপেক্ষ জনকল্যানমুখী রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন। কলেজে ছাত্র অবস্থায় তিনি বঙ্গবন্ধু্র সেজো বোন আমেনা বেগমকে বিয়ে করেন। ইসলামিয়া কলেজ থেকে বিএ পাশ করে তিনি ঢাকায় ফিরে আসেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে ডিগ্রি নিয়ে তিনি বরিশালে ফিরে জেলা আইনজীবি সমিতির সদস্যপদ লাভ করে আইন পেশায় মনোনিবেশ করেন। আইনজীবী ও রাজনীতিক পদে অধিষ্টিত ছিলেন ১৯২১ থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত।
১৯৪৭ সালে ভারত বর্ষ বিভক্ত হয়ে ধর্ম ভিত্তিক পাকিস্তান রাষ্টের জন্ম হলে তা তিনি মেনে নিতে পারেন নি। ঐ সময় কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য না হয়েও তিনি সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার প্রতি ঝুঁকে পড়েন। তখন থেকেই তিনি গণতান্ত্রিক দলের বরিশাল জেলা শাখার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হন। ১৯৫০ সালে বরশাল জেলার বিভিন্ন স্থানে সংগঠিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের পাশে দাঁড়ান। এ কারণেই হিন্দু সম্প্রদায় অধ্যুষিত গৌরনদীতে তখন কোনো দাঙ্গা হতে পারেনি। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে সস্ক্রিয় ভুমিকা পালন করে। গণতন্ত্রী দলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সূচনা হয় ১৯৫৬-৫৭ সালে। ১৯৫৭ সালে ২৫ জুলাই তিনি ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গঠিত হলে তিনি এর কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৬৪ সালে তিনি ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের কেন্দ্রীয় কমিটিরও সদস্য ছিলেন। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু তৎকালীন পূর্ব পাকিস্থানের সার্বিক সায়ত্তশাসন সংবলিত ৬ দফা দাবি উত্থাপন করলে, আব্দুর রব সেরনিয়াবাত আওয়ামীলীগের সাথে যুক্ত না হয়ে সায়ত্তশাসন দাবিকে আরো বেগবান করতে জাতীয় মুক্তিজোট নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। ১৯৬৯ সালে সেরনিয়াবাত আওয়ামীলীগে যোগ দেন এবং দেশব্যাপী ১১ দফা ও ৬ দফা আন্দোলন শুরু হলে , বরিশালে ওই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন তিনি। তিনি ১৯৭০ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত তিনি আওয়ামী লীগ ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য ছিলেন। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি বরিশাল থেকে জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন এবং মুজিবনগরে অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার পরিচালনায় বিশিষ্ট ভূমিকা রাখেন। ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে তিনি ভূমি প্রশাসন, ভূমি সংস্কার এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পানি সম্পদ ও বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। আবদুর রব সেরনিয়াবাত ১৯৭৩ সালে বরিশাল থেকে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি বাংলাদেশ কৃষক-শ্রমিক আওয়ামী লীগের (বাকশাল) কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। এদেশের কৃষকদের মুক্তির লক্ষ্যে তিনি কৃষক আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সামরিক বাহিনীর কতিপয় বিপথগামী সদস্যের হাতে বঙ্গবন্ধু পরিবারের সাথে তিনিও নির্মমভাবে নিহত হন।
একজন অসাম্প্রদায়িক, সংস্কৃতিমনা, জ্ঞানপিপাসু ও জনদরদী নেতা—
যিনি রাজনীতি ও মানবতার এক অনন্য উদাহরণ।
তাঁর জীবন আমাদের শেখায়—
– জ্ঞানচর্চা মানুষকে আলোকিত করে
– ন্যায় ও মানবতার পথে অবিচল থাকাই প্রকৃত নেতৃত্ব
জন্মদিনে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা—
শহীদ আবদুর রব সেরনিয়াবাত, আপনি চিরস্মরণীয়।