২৬শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১১ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ১২ই সফর, ১৪৪৮ হিজরি

একজন রাজস্ব কর্মকর্তার সম্পদ বৃদ্ধির নীরব গল্প

admin
প্রকাশিত জানুয়ারি ২৪, ২০২৬
একজন রাজস্ব কর্মকর্তার সম্পদ বৃদ্ধির নীরব গল্প

Manual7 Ad Code

লোকমান ফারুক, রংপুর

সরকারি কর্মচারী আচরণবিধির ভাষা নির্মম-
চাকরিতে যোগদানের সময় নিজের ও পরিবারের নামে থাকা সব অস্থাবর ও স্থাবর সম্পদের বিবরণ দাখিল করতে হবে। ভুল তথ্য দিলে বা গোপন করলে শাস্তি অবধারিত। কিন্তু কাগজের এই কঠোর ভাষা কি বাস্তবের ইট-সিমেন্টের ওজন বহন করতে পারে?

Manual2 Ad Code

রংপুরের নুরপুরে দাঁড়িয়ে থাকা একাধিক ফ্ল্যাটের ছায়া, টার্মিনাল রোডের (চামড়া পট্টি) রাস্তা-ঘেঁষা দামি জমি, কলেজপাড়ার নিঃশব্দ একখণ্ড জায়গা-সব মিলিয়ে যে সম্পদের গল্প শোনা যায়, তা কাস্টমস্ রাজস্ব কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলাম নামের এক সরকারি কর্মচারীর পরিচিত আয়ের সঙ্গে অদ্ভুত বৈপরীত্য সৃষ্টি করে।
এই বৈপরীত্যই অনুসন্ধানের সূত্রপাত।

পরিবার, পটভূমি ও পদোন্নতির পথ

সিরাজুল ইসলামের পিতা আব্দুল হামিদ-কাস্টমস বিভাগের একজন সাবেক সিপাহী। কুড়িগ্রাম জেলার মানুষ হলেও চাকরির সুবাদে রংপুরে বসবাস, সেখান থেকেই অবসর গ্রহণ। পারিবারিক ঐতিহ্য ধরেই ২০০১ সালে সিরাজুল ইসলাম কাস্টমসে অফিস সহকারী হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি হন উচ্চমান সহকারী, পরে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা, এবং সর্বশেষ রাজস্ব কর্মকর্তা।

Manual3 Ad Code

তার ভাষ্যমতে, বর্তমানে তিনি কর্মরত আছেন কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, ঢাকা (পূর্ব)-এ। পদোন্নতির এই পথ স্বাভাবিক। কিন্তু সম্পদের যে গতিবেগ-তা প্রশ্ন তোলে।

ইটের হিসাব, আয়ের অঙ্ক আর নীরব প্রশ্ন

নুরপুরে পৈত্রিক ভিটায় গড়ে ওঠা ফ্ল্যাট বা বহুতল ভবন।
টার্মিনাল রোডে রাস্তা সংলগ্ন ৭ শতক জমি, যার বাজারমূল্য স্থানীয়দের মতে তিন কোটি টাকাও ছাড়িয়ে যায়।

শহরের কলেজপাড়ায় আরও ৬ শতক জমি, সেখানে একটি অসম্পূর্ণ দোচালা ও ছাপরা ঘর। যেখানে বর্তমানে বসবাস করছেন পরিচিত একজন।

এছাড়া নির্ভরশীলদের নামে থাকা আবাদি জমির তথ্যও রয়েছে।যেগুলো প্রকাশ্যে আসে না। এই সব সম্পদ কি একজন রাজস্ব কর্মকর্তার ঘোষিত আয়ের সীমার মধ্যে পড়ে?

প্রশ্নের মুখে কর্মকর্তা

এই প্রশ্নগুলো নিয়েই মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হয় সিরাজুল ইসলামের সঙ্গে। পরবর্তীতে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো হয় লিখিত প্রশ্নমালা-প্রত্যেকটি সম্পদের অর্থের উৎস কী, তা কি আয়কর নথিতে প্রদর্শিত?

তার জবাব সংক্ষিপ্ত, কিন্তু আত্মবিশ্বাসী—”নুরপুরের বাড়িটি আমার পিতার। চামড়া পট্টির সম্পত্তি আমার শাশুড়ি কিনে আমাদের স্বামী-স্ত্রীর নামে দিয়েছেন।

Manual8 Ad Code

কলেজ রোডের জায়গায় এখনো কোনো স্থাপনা হয়নি।
সবকিছুর হিসাব সরকারি নথিতে আছে। এখানে কোনো অনিয়ম নেই।” কথা এখানেই শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু অনুসন্ধান এখানেই থামে না।

Manual3 Ad Code

সূত্রের ভাষা: যেখানে গল্প ফাঁকফোকর খোঁজে

একাধিক স্থানীয় সূত্র বলছে, নুরপুরের ফ্ল্যাট বা ভবনটি সিরাজুল ইসলামের চাকরিকালেই নির্মিত। ভবনের একাংশে বসবাস করেন তার বাবা-মা। আর টার্মিনাল রোডের সেই ৭ শতক জমি-প্রথমে অন্য একজনের নামে কেনা, পরে দানপত্রের মাধ্যমে হস্তান্তর। একটি দলিল, আরেকটি দলিল-শেষ পর্যন্ত সম্পত্তির গন্তব্য বদলায়, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ বদলায় না।

একজন জ্যেষ্ঠ ভূমি ও দুর্নীতি বিশ্লেষকের মন্তব্য-
“সরকারি কর্মকর্তা/কর্মচারীর কেউ অনেক সময় সরাসরি নিজের নামে সম্পত্তি কেনেন না।
আগে অন্যের নামে কেনা হয়, পরে দান, হেবা বা পারিবারিক হস্তান্তরের মাধ্যমে নিজের বা নির্ভরশীলের নামে ফিরিয়ে আনা হয়। এটি জবাবদিহিতা এড়ানোর পরিচিত কৌশল।

তিনি আরও বলেন,”দলিল বৈধ দেখালেই সম্পদ বৈধ হয় না। উৎস যদি অসৎ হয়, তাহলে দুর্নীতি দমন কমিশনের যাচাই ও তদন্ত অনিবার্য।

নথির নীরবতা ও নৈতিক প্রশ্ন

সরকারি আচরণবিধি শুধু কাগজে লেখা নিয়ম নয়-এটি রাষ্ট্রের সঙ্গে একজন কর্মচারীর নৈতিক চুক্তি।

প্রশ্ন হলো- ঘোষিত আয়ের বাইরে এই সম্পদ কি যথাযথভাবে ঘোষিত? পরিবারের নামে থাকা সম্পত্তির প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ কার হাতে? দানপত্র কি দানেরই দলিল, নাকি দায় এড়ানোর কৌশল?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো নথির পাতায় নীরব।

শেষ কথা: ইট-সিমেন্ট কি কথা বলে?

রাজস্ব কর্মকর্তা সেই ব্যক্তি, যিনি রাষ্ট্রের পক্ষে অন্যের আয় ও সম্পদের হিসাব নেন। কিন্তু যখন সেই হিসাবের খাতা নিজেই ধোঁয়াটে হয়ে ওঠে, তখন প্রশ্নটা আর ব্যক্তিগত থাকে না-তা হয়ে ওঠে রাষ্ট্রীয়।

নুরপুরের ভবনের দেয়াল, টার্মিনাল রোডের জমির সীমানা, কলেজপাড়ার নীরব উঠান—সব যেন এক অদৃশ্য প্রশ্ন ছুড়ে দেয়-এই সম্পদের প্রকৃত মূল্য কি শুধু টাকায়, নাকি বিশ্বাসেও?
উত্তর দেবে কি নথি? নাকি তদন্ত?