৯ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৬শে চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ২১শে শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি

বিগত ১৫ বছরের দায় স্বীকার, পুলিশের শীর্ষে ‘গণবিরোধী কাজ করেছি’

admin
প্রকাশিত জানুয়ারি ১১, ২০২৬
বিগত ১৫ বছরের দায় স্বীকার, পুলিশের শীর্ষে ‘গণবিরোধী কাজ করেছি’

Manual1 Ad Code

লোকমান ফারুক, রংপুর

রংপুর পুলিশ লাইন স্কুল অ্যান্ড কলেজের মাঠ। শীতের দুপুর। চারদিকে নীরব কৌতূহল—ক্যামেরার লেন্স, নোটবুক আর অপেক্ষমাণ প্রশ্নের ভিড়। ঠিক তখনই পুলিশের সর্বোচ্চ পদে থাকা মানুষটি এমন এক বাক্য উচ্চারণ করলেন, যা দীর্ঘদিনের নীরবতা ভেঙে দিল।

“বিগত ১৫ বছরে আমরা অনেক গণবিরোধী কাজ করেছি।”

বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলমের কণ্ঠে ছিল না কোনো উচ্চস্বরে আত্মপক্ষ সমর্থন, ছিল না প্রচলিত আমলাতান্ত্রিক সতর্কতা। ছিল এক ধরনের স্বীকারোক্তি। যেন একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বিবেক হঠাৎ করেই কথা বলতে শুরু করেছে।

আইজিপি বলেন, “গত দেড় দশকে পুলিশ একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বলয়ের ছায়ায় দাঁড়িয়ে পড়েছিল।

পুলিশ দলীয় পুলিশ হিসেবে গড়ে উঠেছিল,’ এই স্বীকারোক্তি উচ্চারিত হতেই মাঠের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। তিনি স্বীকার করেন, বাহিনীর ভেতরে লোভ, দলকানা নেতৃত্ব এবং নৈতিক বিচ্যুতি পুলিশকে জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটেই জুলাই, আগস্ট মাসের রক্তাক্ত অধ্যায়। আন্দোলন, গুলি, প্রাণহানি-হাজারো প্রশ্নের ভার এখনো রাষ্ট্রের ঘাড়ে। আইজিপির ভাষায়, “বিপুল পরিমাণ আন্দোলনকারী প্রাণ দিয়েছেন, শহীদ হয়েছেন।

সেইসব মৃত্যু পুলিশের ওপর একটি ঐতিহাসিক দায় চাপিয়েছে—নিজেদের ভুল শুধরে আবার দাঁড়ানোর দায়। গত এক বছরে সেই চেষ্টা চলেছে বলে জানান তিনি। শতভাগ সফলতা না এলেও চেষ্টা থেমে নেই-এই কথাটিই যেন তার বক্তব্যের কেন্দ্রে।

Manual1 Ad Code

অপরাধ নিয়ন্ত্রণ প্রসঙ্গে আইজিপি বাস্তবতার কঠিন পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। ” প্রতি বছর দেশে সাড়ে তিন থেকে চার হাজার হত্যাকাণ্ড ঘটে। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন বাস্তবতা নয়, বরং দীর্ঘদিনের চিত্র। আমাদের লক্ষ্য একজন লোকও যেন মারা না যায়, বললেন তিনি।

তবে স্বীকার করেন, পরিপূর্ণতা একটি চলমান সংগ্রাম, যেখানে ব্যর্থতা অনিবার্য। শরীফ ওসমান হাদির মৃত্যু সেই ব্যর্থতারই এক নির্মম প্রতীক। যা জাতিকে নাড়িয়ে দিয়েছে। আইজিপির ভাষায়, এই ঘটনা পুলিশের ওপর বিচার নিশ্চিত করার কঠিন দায়িত্ব চাপিয়েছে।

খুলনা অঞ্চলের একাধিক হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্‌ঘাটনের কথাও তুলে ধরেন তিনি। যেন ব্যর্থতার ভিড়েও সাফল্যের দাবিটুকু হারিয়ে না যায়।

আসন্ন জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা নিয়ে উদ্বেগ-এই প্রশ্নে আইজিপি দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, “নির্বাচন উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করা পুলিশের একক দায়িত্ব নয়।

ছয় লাখ আনসার সদস্য, সেনাবাহিনী, নৌ ও বিমানবাহিনী, বিজিবি, কোস্ট গার্ড-সবাই মিলেই রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বলয়। তবে সবচেয়ে বিতর্কিত প্রসঙ্গ ‘ডেভিল হান্ট অপারেশন।

১৩ ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া ফেইজ-২ নিয়ে সমালোচনা আছে, ক্ষোভ আছে। প্রার্থীদের অভিযোগ- গ্রেপ্তারে মাঠ ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। আইজিপির জবাব “সংক্ষিপ্ত কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ’ আমরা অবজেক্টিভলি কাজ করার চেষ্টা করছি। যারা সম্ভাব্য হুমকি, যারা নির্বাচনের পরিবেশ নষ্ট করতে পারে, তাদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।

Manual8 Ad Code

আবার যারা নির্দোষ, আন্দোলন-পরবর্তী মামলায় ‘নামমাত্র আসামী’ তাদের মুক্তির চেষ্টাও চলছে। “শত শত নাম ফর নাথিং-এই বাক্যেই ফুটে ওঠে মামলাবাণিজ্যের ভয়াবহতা।

Manual8 Ad Code

কিন্তু আইজিপির সবচেয়ে আবেগঘন আবেদনটি আসে একেবারে শেষ দিকে। তিনি প্রশ্ন ছুড়ে দেন সমাজের দিকে। “অপরাধী ধরার পর যদি থানা ঘেরাও হয়, রাস্তায় অচলাবস্থা তৈরি হয়, তবে পুলিশ কিভাবে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করবে?

ন্যায় কাজটা আমাকে করতে দেন,-এই অনুরোধে ছিল ক্ষমতার দাবি নয়, বরং দায়িত্ব পালনের আর্তি।

এর আগে পুলিশ লাইন স্কুল অ্যান্ড অডিটোরিয়ামে রংপুর রেঞ্জের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিশেষ কল্যাণ সভায় বক্তব্য রাখেন আইজিপি বাহারুল আলম।

Manual6 Ad Code

দুপুরের রোদ তখন ঢলে পড়ছিল। মাঠে দাঁড়িয়ে থাকা সাংবাদিকেরা বুঝছিলেন-এটি আর দশটা প্রেস ব্রিফিং নয়। এটি ছিল একটি প্রতিষ্ঠানের আত্মসমালোচনা, একটি রাষ্ট্রযন্ত্রের নিজেকে আয়নার সামনে দাঁড় করানোর মুহূর্ত।

বাংলাদেশ পুলিশ কি সত্যিই ‘স্বমহিমায়’ ফিরতে পারবে? এই প্রশ্নের উত্তর আপাতত ভবিষ্যতের হাতে। তবে স্বীকারোক্তির এই মুহূর্ত ইতিহাসে থেকে যাবে।