১৭ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৪ঠা ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ২৯শে শাবান, ১৪৪৭ হিজরি

ঠাকুরগাঁওয়ে জিংক ধানের সম্প্রসারণে অগ্রণী কৃষক প্রশিক্ষণ ও বীজ বিতরণ

admin
প্রকাশিত ডিসেম্বর ৫, ২০২৫
ঠাকুরগাঁওয়ে জিংক ধানের সম্প্রসারণে অগ্রণী কৃষক প্রশিক্ষণ ও বীজ বিতরণ

Manual1 Ad Code

বিশেষ প্রতিনিধি

হরিহরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে তখন শীতের সকালের কুয়াশা মিলিয়ে যাচ্ছে। মাঠজুড়ে জড়ো হওয়া কৃষকদের মুখে কৌতূহল, অনেকে হাতে খাতা-কলম। যেন পরিচিত কোনও কৃষি প্রশিক্ষণ নয়—বরং পুষ্টি-নিরাপত্তার এক নিঃশব্দ লড়াইয়ের সূচনা।

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার রহিমানপুর ইউনিয়নে আন্তর্জাতিক খাদ্যনীতি গবেষণা ইনস্টিটিউট (IFPRI)–এর হারভেস্ট প্লাস প্রোগ্রামের রিঅ্যাক্টস-ইন প্রকল্পের উদ্যোগে গতকাল অনুষ্ঠিত হলো অগ্রণী কৃষক প্রশিক্ষণ ও বীজ বিতরণ অনুষ্ঠান। পরিচালনায় ছিল ওয়ার্ল্ড ভিশন ও ইএসডিও।

সভাপতিত্ব করেন উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ মো. নাসিরুল আলম। প্রধান অতিথির বক্তব্যে হারভেস্টপ্লাস বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজার কৃষিবিদ মো. ওয়াহিদুল আমিন তপু বলেন, ‘জিংক শুধু একটি উপাদান নয়, এটি অপুষ্টির বিরুদ্ধে ঢাল। কৃষকের হাতে জিংক-সমৃদ্ধ জাত পৌঁছে গেলে পুরো চক্রটাই বদলে যায়—খাদ্য, স্বাস্থ্য, কর্মক্ষমতা।’

Manual2 Ad Code

বিশেষ অতিথি প্রোগ্রাম ম্যানেজার কৃষিবিদ মো. মজিবর রহমান পুষ্টিহীনতার চক্র ভাঙতে বায়োফরটিফিকেশনের বৈজ্ঞানিক প্রমাণ তুলে ধরেন। প্রকল্প ফোকাল কৃষিবিদ মো. আশরাফুল আলম, উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মারুফা খাতুন এবং ওয়ার্ল্ড ভিশনের কর্মকর্তারাও মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।

Manual8 Ad Code

অনুষ্ঠানের মূল সেশনটি যেন এক ধরনের আলাপ-আলোচনার থিয়েটার। বক্তারা ব্যাখ্যা করছিলেন মানবদেহে জিংকের ভূমিকা—রোগ প্রতিরোধ থেকে শিশুদের বৃদ্ধি, গর্ভকালীন স্বাস্থ্য থেকে প্রজননক্ষমতা পর্যন্ত। বলা হচ্ছিল, জিংকের ঘাটতি কীভাবে ধীরে ধীরে মানুষের শক্তি, উৎপাদন ও জীবনমানকে ক্ষয় করে। কৃষকেরা প্রশ্ন তুলছিলেন, তুলনা করছিলেন অভিজ্ঞতা, আবার নিজেরাই বলছিলেন—’জিংক ধান চাষ হলে আমাদের ফসল যেমন বাড়বে, মানুষও ভালো থাকবে।’

অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে ২৩৭ জন কৃষকের কাছে ৮৪৮ কেজি ব্রি ধান–১০২ জাতের ভিত্তি বীজ বিতরণ করা হয়। প্রতিজন পান ৪ কেজি করে বীজ—কিন্তু সেটি কেবল বীজ নয়, যেন অপুষ্টির বিরুদ্ধে এক মাঠযুদ্ধের প্রতীক।

কানাডা সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত রিঅ্যাক্টস-ইন প্রকল্পটি বাংলাদেশসহ চার দেশে একইসঙ্গে বাস্তবায়িত হচ্ছে। হারভেস্টপ্লাসের কার্যক্রম মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন করছে ইএসডিও। প্রতিষ্ঠানটি জিংক-সমৃদ্ধ ধান, গম ও আয়রন-সমৃদ্ধ মসুরের জাত উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে কাজ করছে। বর্তমানে দেশে আমন মৌসুমে ব্রি-৭২, বিনা-২০ এবং বোরোতে ব্রি-৭৪, ৮৪, ১০০ ও ১০২ জাতের জিংক ধান দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

দিনের আলো যখন বাড়ছিল, কৃষকদের ভিড় তখন ধীরে ধীরে ছড়াতে শুরু করেছে। হাতে ছোট্ট বীজের প্যাকেট, কিন্তু চোখে বড় ভবিষ্যতের ছবি। গল্পটি শেষ হলেও প্রশ্নটি থেকে যায়—একটি ক্ষুদ্র বীজ কত দূর পর্যন্ত বদলে দিতে পারে এক গ্রামের খাদ্য-বাস্তবতা, কিংবা এক অঞ্চলের পুষ্টির নিয়তি?

Manual5 Ad Code

মাঠের ভিড় পেছনে ফেলে সেই প্রশ্নটিই যেন বাতাসে ভেসে রইল।

Manual5 Ad Code