১৭ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৪ঠা ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ২৯শে শাবান, ১৪৪৭ হিজরি

শিক্ষার্থী র‍্যাগিংয়ের ঘটনায় উত্তাল বেরোবি, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তদন্তের নির্দেশ

admin
প্রকাশিত নভেম্বর ২৪, ২০২৫
শিক্ষার্থী র‍্যাগিংয়ের ঘটনায় উত্তাল বেরোবি, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তদন্তের নির্দেশ

Manual5 Ad Code

ডেস্ক রিপোর্ট, রংপুর

রবিবার রাতের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয়–২৪ হলটা নিস্তব্ধ থাকার কথা ছিল। শীতের শুরুতে হলের ছাদে দাঁড়িয়ে ছাত্রদের আড্ডা, হালকা কথাবার্তা—অতিরিক্ত কিছু নয়। কিন্তু রাত সাড়ে ৯টায় সেই ছাদের নীরবতা ভেঙে যায় এক অচেনা কান্নার শব্দে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই পুরো হল জেগে ওঠে—এ যেন আচমকা অদৃশ্য কোনো রণক্ষেত্র তৈরি হয়ে গেছে।

সেই কান্নার মালিক বাংলা বিভাগের ১৭ ব্যাচের শিক্ষার্থী দ্বীন ইসলাম। অভিযোগ—একই বিভাগের কয়েকজন সিনিয়র শিক্ষার্থী তাকে ‘ম্যানার শেখানোর’ নামে ছাদে ডেকে নিয়ে শারীরিক হয়রানি করেন। ভুক্তভোগীর কান্না আর অসুস্থতার খবর ছড়িয়ে পড়তেই আবাসিক ছাত্ররা ছুটে যান। দুজন অভিযুক্ত পালিয়ে যান; দুজনকে আটকে ঘটনা শুনতে জড়ো হয় আরও অনেকে। ঘটনার বিবরণ শুনে মনে হচ্ছে, এটি কোনো একক ঘটনার আকস্মিক বিস্ফোরণ নয়; বরং বহু পুরোনো এক সংস্কৃতির অন্ধকার প্রতিচ্ছবি—র্যাগিং।

Manual1 Ad Code

কী ঘটেছিল ছাদে? চোখের সামনে ঘটনার কিছুটা দেখেছিলেন উপস্থিত শিক্ষার্থীরা। তাদের ভাষ্যে—সেদিন রাত সাড়ে ৯টার দিকে বাংলা ১৬ ব্যাচের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ আল মামুন, তার সঙ্গে রাফি আহমেদ, মনিরুজ্জামান ও সাইদুল সাকিল—১৭ ব্যাচের কয়েক শিক্ষার্থীকে ডেকে নেন। ‘ম্যানার শেখানো’র নামেই নাকি এসব করা হতো।

এক পর্যায়ে মামুন থাপ্পড় দেন দ্বীন ইসলামের কানে। সেই আঘাতের পরই সে কান্নায় ভেঙে পড়ে। শিক্ষার্থীরা ছুটে আসতেই সিনিয়রদের দুজন পালিয়ে যায়। বাকিরা পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করলেও তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে—ঘটনা পুরো হলে ছড়িয়ে গেছে।

অভিযুক্তের দাবি: ‘তেমন কিছু হয়নি’ ঘটনার পর অভিযুক্তদের একজন আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন—’তেমন কিছুই হয়নি। ছেলেটি অভিনয় করেছে। হলের ভাইয়েরা আসার পরই সে কান্না শুরু করে।’ তার বক্তব্যে অস্বীকারের সুর! কিন্তু ঘটনাস্থলে থাকা শিক্ষার্থীরা বলছেন ভিন্ন কথা।

প্রশাসনের পদক্ষেপ: ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম র্যাগিংয়ের অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও হল প্রশাসন দ্রুত ঘটনাস্থলে যায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য শোনেন সহকারী প্রভোস্ট। শিক্ষার্থীরা সেখানে দ্রুত বিচার, অভিযুক্তদের আজীবন বহিষ্কার এবং র্যাগিংয়ের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান দাবি করেন। হল প্রশাসন পরে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে।

Manual1 Ad Code

কমিটির আহ্বায়ক সহকারী প্রভোস্ট ড. এ.টি.এম. জিন্নাতুল বাসার, সদস্য সাইফুদ্দীন খালেদ ও সহকারী প্রক্টর ফায়সাল-ই-আলম। হলের প্রভোস্ট আমির শরিফ জানালেন—’২৪ ঘণ্টার মধ্যে রিপোর্ট দিতে হবে। রিপোর্ট পেলেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. ফেরদৌস রহমান আরও স্পষ্ট ‘র্যাগিংয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের জিরো টলারেন্স। কেউ ছাড় পাবে না। রিপোর্ট পেলে শৃঙ্খলা বোর্ড দ্রুত ব্যবস্থা নেবে।’ একটি প্রশ্ন: সহপাঠীর ওপর কর্তৃত্বের এই অন্ধ অধিকার কোথা থেকে আসে?

রাতের ছাদে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়। এটি আমাদের সমাজে প্রোথিত এক ভুল ক্ষমতাবোধের প্রতিফলন। সিনিয়র হওয়ার পরিচয় কি সত্যিই কাউকে অন্যের ওপর হাত তোলার অধিকার দেয়? শৃঙ্খলা, নিয়ম, ম্যানার—এসব শেখানোর নামে সহিংসতা কোন শিক্ষার অংশ? প্রতিবার কোনো ঘটনা ঘটলে তদন্ত, কমিটি, বিবৃতি—সবই হয়।

Manual3 Ad Code

কিন্তু প্রশ্নটি রয়ে যায়—র্যাগিং কি ধরা পড়ে ধরা পড়ার পরে, নাকি প্রতিদিনই তা অদৃশ্যভাবে চলতে থাকে? রবিবার রাতের সেই ছাদ এখন আবার নীরব। রংপুরের আকাশে শীতের হাওয়া—যেমন ছিল ঠিক তেমনই। কিন্তু ছাদের সেই নীরবতা মনে করিয়ে দেয়: কান্নার শব্দ থেমে গেছে ঠিকই, কিন্তু র্যাগিংয়ের বিরুদ্ধে নৈতিক লড়াই এখনো শেষ নয়।

Manual8 Ad Code