৯ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৬শে চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ২১শে শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি

বিচার বিভাগ ব্যর্থ হলে রাষ্ট্র-গণতন্ত্রও ব্যর্থ হয়ে যায়: প্রধান বিচারপতির অগ্নিঝরা বার্তা

admin
প্রকাশিত নভেম্বর ২২, ২০২৫
বিচার বিভাগ ব্যর্থ হলে রাষ্ট্র-গণতন্ত্রও ব্যর্থ হয়ে যায়: প্রধান বিচারপতির অগ্নিঝরা বার্তা

Manual8 Ad Code

বিশেষ প্রতিনিধি

২২ নভেম্বর ২০২৫ সোনারগাঁওয়ের ঠান্ডা কনফারেন্স হলে হঠাৎ টানটান উত্তেজনা ঢাকার হোটেল সোনারগাঁও।

Manual7 Ad Code

শনিবার সকালে বে অব বেঙ্গল কনভারসেশনের উদ্বোধনী সেশন শুরু হয়েছে ঠিকঠাকমতো। নরম আলো, নিস্তরঙ্গ পরিবেশ, বিদেশি কূটনীতিক, গবেষক, নীতি–নির্ধারকদের নিঃশব্দ গুঞ্জন। কিন্তু প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ মাইকে দাঁড়াতেই যেন পরিবেশ বদলে গেল। কণ্ঠে ছিল না সৌজন্যমূলক বক্তৃতার মোলায়েমতা—ছিল সতর্ক ঘণ্টাধ্বনি।

তিনি বললেন, “বিচার বিভাগ ব্যর্থ হলে রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়, গণতন্ত্র ব্যর্থ হয়। তখন সংবিধানও নির্বাক হয়ে যায়।” হলরুমে এক মুহূর্তের জন্য এমন নীরবতা নেমে এলো, যেন কেউ নিজের চেয়ারের পিঠ হেলে বসার শব্দও শোনার মতো স্পষ্ট। তার এই বক্তব্যে উপস্থিত কয়েকজন পরস্পরের দিকে তাকালেন—কারণ, এমন স্পষ্ট, নির্ভীক এবং রাষ্ট্রের ভিত ধরিয়ে দেওয়া ধরনের ঘোষণা সাম্প্রতিক কালের কোনো বিচারপতির মুখে বেশি শোনা যায়নি। জুলাই বিপ্লবের ছায়া—রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে শুদ্ধির ডাক প্রধান বিচারপতি তার বক্তব্যে ফিরে গেলেন দেশের উত্তাল জুলাই বিপ্লবের প্রসঙ্গে।

তিনি বলেন, “জুলাই বিপ্লব সংবিধানকে উৎখাত করতে নয়—বরং সম্পর্ককে বিশুদ্ধ করতে উদ্দীপ্ত হয়েছিল।” এ বক্তব্যে নড়েচড়ে বসে কয়েকটি মিডিয়ার প্রতিনিধি। কারণ জুলাই বিপ্লবের সূত্রপাত থেকে শুরু করে গণবিক্ষোভ—দেশের ক্ষমতা কাঠামোতে বড় ধরনের ধাক্কা—এসব এখনো বিশ্বমানচিত্রে আলোচিত। তিনি আরও বললেন—”স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, জনসাড়া—এই তিন গুণ জনমানসের প্রধান সুর হয়ে উঠেছিল।” এ যেন শুধু বিশ্লেষণ নয়, ভবিষ্যতের রাষ্ট্রচিত্র আঁকার পূর্বাভাস। আদালত যে শুধু রায় দেয় না, রাষ্ট্রের গতি-দিকও নির্ধারণ করে প্রধান বিচারপতির বক্তব্যের সবচেয়ে তীক্ষ্ণ অংশটি ছিল বিচার বিভাগীয় সংস্কার প্রসঙ্গে।

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের রোডম্যাপ—যা জনসমক্ষে খুব কমই এসেছে—তার ভেতরের সারকথা টেনে আনলেন তিনি। “বিচার বিভাগের সংস্কার শুধু সৌন্দর্যবর্ধন নয়—এটি গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম,” ঘোষণা করে তিনি মনে করিয়ে দিলেন: প্রশাসনিক দুর্বলতাই বিচার ব্যবস্থার বৃহত্তম ভার। হলরুমের পেছন দিকে বসা একজন সিনিয়র আইনজীবী—যার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পরে পাওয়া যায়—মৃদু হেসে বললেন, “এটা রীতিমতো ‘ওয়াটারগেট টাইপ’ স্টেটমেন্ট। সোজা হাড়ে ঘা।” বিশ্বরাজনীতির উত্তাপ—বাংলাদেশের সামনে নতুন সমীকরণ পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেনও বক্তব্য রাখেন। কিন্তু তার কণ্ঠে ছিল এক ধরনের কূটনৈতিক সতর্কতা।

Manual4 Ad Code

তিনি বলেন—”অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বড় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে আমরা জাতীয় স্বার্থকেই প্রধান্য দিচ্ছি।” এটি এমন সময়ের কথা, যখন বিশ্বজুড়ে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে নতুন করে অবস্থান বদলাচ্ছে। রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে তিনি স্পষ্ট করলেন—”সমাধানের জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে নিজেদের নিরাপত্তা ভেবে।” অর্থাৎ, আন্তর্জাতিক সমর্থন প্রয়োজন হলেও দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশেরই। একজন কূটনীতিক—যিনি নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক—বললেন,”বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপথ এখনো অনিশ্চিত।

Manual5 Ad Code

বিচার বিভাগ যে দৃঢ় বার্তা দিল—তা বিদেশি পর্যবেক্ষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সংকেত।” পর্দার আড়ালের তথ্য—বিচার বিভাগ কেন এত দৃঢ় অবস্থানে? সিজিএস–এর একজন গবেষক, যিনি সংস্কার রোডম্যাপ তৈরির কাজে পরামর্শ দিয়েছেন, তিনি আলাপচারিতায় বলেন, “গত তিন বছর ধরে আদালতের প্রশাসনিক ব্যর্থতা—মামলা জট, বিচারক নিয়োগ, দুর্নীতি, রাজনৈতিক চাপ—এসব নিয়ে ভেতরে ভেতরে চাপ জমছিল। রোডম্যাপ মূলত সেই চাপেরই নথিভুক্ত সংস্করণ।”

তিনি আরও জানান, জুলাই বিপ্লবের পর বিচার বিভাগের ওপর নতুন সামাজিক প্রত্যাশা সৃষ্টি হয়েছে—এটা আদালতও বুঝেছে। তাই এখন নৈতিক অবস্থান কঠোরভাবে ঘোষণা করা ছাড়া উপায় ছিল না। ‘নিঃশব্দ নাটক’—সোনারগাঁওয়ের করিডোরে যে প্রশ্ন গুঞ্জন তুলল উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষ হলে লবির করিডোরে অনেকের মুখে একটাই প্রশ্ন—’এই বার্তা কি রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য সতর্ক সংকেত?’ বিদেশি গবেষক, নিরাপত্তা পরামর্শক, কয়েকজন পর্যবেক্ষক—প্রতিটি দলের আলোচনা ঘুরপাক খাচ্ছিল একই জায়গায়: বাংলাদেশ কি তার বিচার বিভাগকে নতুন ভূমিকায় দেখতে চলেছে। এ যেন প্রতিটি বাক্যের পেছনে লুকিয়ে আছে এক একটি আপাতনিরীহ, কিন্তু রাষ্ট্রচিত্র বদলে দিতে সক্ষম খণ্ড-তথ্য।

Manual6 Ad Code

এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ৮৫টি দেশের ২০০ আলোচক ও এক হাজারের বেশি অংশগ্রহণকারী উপস্থিত থাকা—সবকিছু ছাপিয়ে একটিই বক্তব্য আজ আলোচনায় শীর্ষে। প্রধান বিচারপতির ওই বাক্যটি— “বিচার বিভাগ ব্যর্থ হলে রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়।” এই বাক্যটি শুধু সতর্কবার্তা নয়—এটি যেন জুলাই পরবর্তী বাংলাদেশের রাষ্ট্রবোধের নতুন অবয়ব। বহু প্রশ্ন রয়ে গেল: বিচার বিভাগ কি এখন সত্যিই রাজনৈতিক পরিবর্তনের নীরব নিয়ন্ত্রক? সংস্কার, রোডম্যাপ কি আগামীর রাষ্ট্রগঠনের চাবিকাঠি? বাংলাদেশ কি বিচারিক নৈতিকতা ও গণতান্ত্রিক শুদ্ধির নতুন ছকে ঢুকতে যাচ্ছে?

সোনারগাঁওয়ের নরম আলো-জ্বলা হলে উচ্চারিত এই সতর্ক ঘোষণা হয়তো আগামী মাসগুলোতে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে—রাষ্ট্রের গতিপথ বদলের সম্ভাবনায়। আর শেষ পর্যন্ত—যদি বিচার বিভাগের কণ্ঠ শক্ত থাকে, তবে সংবিধানও আর নির্বাক থাকবে না।