৮ই ডিসেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ, ২৩শে অগ্রহায়ণ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ১৭ই জমাদিউস সানি, ১৪৪৭ হিজরি

হাসিনাকে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রশ্নে ভারতের নীরবতা: বিবিসিকে শীর্ষ কর্মকর্তাদের আভাস

admin
প্রকাশিত নভেম্বর ১৮, ২০২৫
হাসিনাকে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রশ্নে ভারতের নীরবতা: বিবিসিকে শীর্ষ কর্মকর্তাদের আভাস

Manual6 Ad Code

হাসিনাকে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রশ্নে ভারতের নীরবতা: বিবিসিকে শীর্ষ কর্মকর্তাদের আভাস

অনলাইন ডেস্ক : ভারতের নয়াদিল্লির শীতল নভেম্বরের বাতাসে যেন অদৃশ্য চাপের রেখা ভাসছিল। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা পর ভারত যে সংক্ষিপ্ত বিবৃতি পাঠাল, তার শব্দে ছিল কূটনৈতিক সৌজন্য, কিন্তু অন্তর্নিহিত দ্বিধাও স্পষ্ট—”রায় আমাদের নজরে এসেছে… ভারতের অঙ্গীকার বাংলাদেশের মানুষের পাশে।”
কিন্তু এই বাক্যের আড়ালে আরও বড় এক গল্প লুকিয়ে আছে।

বিবিসিকে দেওয়া মন্তব্যে ভারতের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন—রায় হলেও দিল্লির অবস্থান বদলাচ্ছে না। আর তাকে বাংলাদেশের হাতে তুলে দেওয়ার প্রশ্ন? তাদের ভাষায়, “এখনো ওঠেনি।”
এই একটি বাক্যই যেন দীর্ঘ ছায়ার মতো ছড়িয়ে পড়ছে ঢাকার কূটনৈতিক মহলে।

ভারতের অবস্থান—‘ফর দ্য টাইম বিয়িং’ আশ্রয়

বিবিসির প্রতিবেদনের বর্ণনায় উঠে এসেছে এক বছরের পুরোনো তথ্য: ৫ আগস্ট দেশ থেকে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর থেকেই দিল্লির অবস্থান একই—শেখ হাসিনাকে কেবল সাময়িক সুরক্ষার জন্য রাখা হয়েছে।
“এর বেশি নয়”—ভারত এটি বারবার বলেছে, কিন্তু কখনো লিখিতভাবে নয়।

এক ভারতীয় কূটনীতিক বিবিসিকে বলেছেন, ‘যে পরিস্থিতিতে তিনি এসেছেন, সেটি বিবেচনায় নিয়েই আমরা তাঁকে রাখছি। ভারতের নীতি এখনও অপরিবর্তিত।’
ট্রাইব্যুনালের রায়ের পরও সেই নীতি অপরিবর্তিত—এমন স্পষ্ট বার্তাই দিল্লির উচ্চমহল থেকে পাওয়া যাচ্ছে।

বাংলাদেশের আবেদন—আরও বড় প্রশ্নগুলো সামনে

এখন প্রশ্ন—বাংলাদেশ যেই প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় তাকে ফেরত চেয়েছে, তার কী হবে? গত বছরের ডিসেম্বরে ‘নোট ভার্বাল’ পাঠানোর পরে ভারত অত্যন্ত দ্রুত তার স্বীকৃতি দিলেও এরপর পুরো বছর তারা নীরব থেকেছে—নিঃশব্দ, যেন গলা পর্যন্ত পানি উঠে এলেও ঠাণ্ডা মাথায় শ্বাস ধরে রাখা।
এবার রায় ঘোষণার পর পরিস্থিতি বদলাচ্ছে।
চাপ বাড়ছে। এবং ভারতের ওপর বিশ্বের দৃষ্টি আরও তীব্র হচ্ছে।

চুক্তির ভেতরের ফাঁকফোকর—যেখানে ভারত দাঁড়িয়ে থাকতে পারে

২০১৩ সালের প্রত্যর্পণ চুক্তিটি পাতা খোলার সঙ্গে সঙ্গেই দেখা যায় একাধিক ধারা ফাঁকা জায়গা রেখে দিয়েছে—যথেষ্টই কূটনৈতিক কৌশল প্রয়োগের সুযোগ।
ধারা অনুযায়ী, যদি অভিযোগ ‘রাজনৈতিক প্রকৃতির’ হয় তবে তা খারিজ করা যায়। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে—শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো হত্যা, গুম, নির্যাতন ও গণহত্যার মতো অপরাধের অন্তর্ভুক্ত। এগুলো কোনোভাবেই ‘রাজনৈতিক অপরাধের’ মধ্যে পড়ে না।

২০১৬ সালের সংশোধনীতে তো চুক্তি আরও সহজ করা হয়েছিল—অভিযোগ প্রমাণ না দিলেও চলবে; কেবল আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দিলেই অনুরোধ বৈধ।

তবুও ভারতের হাতে এখনো বেশ কিছু অস্ত্র রয়ে গেছে।
যেমন: যদি ভারতের মনে হয় অভিযোগগুলো ন্যায়বিচারের স্বার্থে আনা হয়নি, তবে অনুরোধ খারিজের অধিকার তাদের আছে।

যদি অভিযোগগুলো সামরিক অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়, তবে সেগুলো ফৌজদারির আওতায় পড়ে না- এছাড়াও আবেদন নাকচ করা যায়। কিংবা ভারত দাবি করতে পারে—বাংলাদেশের বিচার প্রক্রিয়ায় সরল বিশ্বাসের ঘাটতি ছিল।

দিল্লির এক অভিজ্ঞ পর্যবেক্ষক বললেন—
‘ভারত যদি চাই, চুক্তির এই ধারাটিই ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে। বিচারটির নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সে অনুরোধ সহজেই নাকচ করা সম্ভব।’

ভারতের নীরব যুক্তি—দিল্লির ‘অদৃশ্য’ আত্মবিশ্বাস

ভারত কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বলেনি যে তারা শেখ হাসিনাকে ফেরত দেবে না। কিংবা কখনো বলেনি যে দেবে। বিবিসিকে দেওয়া সর্বশেষ সংকেতই তাই সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ—রায় পরিবর্তন আনেনি; অবস্থান একই।

Manual3 Ad Code

একজন ভারতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা কথায় না বলেও যেন বার্তাটা দিয়ে দিলেন—’আমরা জানি কোন মুহূর্তে কোন দরজা খোলা রাখবো, আর কোনটা বন্ধ।’

বাংলাদেশের সামনে বাস্তবতা—চাপের ঘন কুয়াশা

Manual4 Ad Code

ঢাকার একজন সাবেক রাষ্ট্রদূত বললেন—
“সাজাপ্রাপ্ত একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে ফেরত না দেওয়ার অবস্থানকে এখন আর রাজনৈতিক সৌজন্য দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না। এটি কূটনৈতিক চাপের বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। তিনি আরও যোগ করলেন—’ভারতকে এখন প্রশ্নের মুখে পড়তেই হবে—কেন তারা একজন দণ্ডিত অপরাধীকে আশ্রয় দিচ্ছে?

শেষ প্রশ্ন—রায় বদলাবে না, নীতি বদলাবে?

Manual7 Ad Code

ভারত জানে, এখন ব্যাখ্যা দিতে হবে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনও তাকিয়ে আছে।
কিন্তু দিল্লির নীতি—তার মতোই দৃঢ়।

Manual5 Ad Code

গল্পের শুরুতে যেভাবে তারা বলেছিল—”ফর দ্য টাইম বিয়িং”—শেষেও ঠিক তেমনই রয়ে গেল।
এ যেন ঢেউ এসে পাথরে আছড়ে পড়ে আবার ফিরে যাওয়া—ভারতকে যুক্তি দিতে হবে, কিন্তু অবস্থান বদলাতে হবে না।

এই অমোঘ বৈপরীত্যেই দক্ষিণ এশিয়ার কূটনীতির চলমান নাটকীয়তা—যেখানে রায়ও বদলায়, সরকারও বদলায়, কিন্তু ভূ-রাজনীতির দৃশ্যপট যেন একই থাকে, একই সুরে বারবার ফিরে আসে।