৯ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৬শে চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ২১শে শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি

হাম-আতঙ্কের ভেতর পাঁচ শিশু, রমেকে নীরব লড়াই

Editor
প্রকাশিত এপ্রিল ২, ২০২৬
হাম-আতঙ্কের ভেতর পাঁচ শিশু, রমেকে নীরব লড়াই

Manual4 Ad Code

হাম-আতঙ্কের ভেতর পাঁচ শিশু, রমেকে নীরব লড়াই

লোকমান ফারুক, রংপুরঃ রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করিডোরে দুপুরের আলোটা আজ একটু অন্যরকম। সাদা দেয়ালে যেন অদৃশ্য এক উদ্বেগের ছায়া। শিশু ওয়ার্ডের সামনে দাঁড়ালে বোঝা যায় এখানে কেবল চিকিৎসা চলছে না, চলছে এক অদেখা আশঙ্কার সঙ্গে লড়াই। আইসোলেশন ওয়ার্ডের দরজা বন্ধ। ভেতরে পাঁচটি ছোট্ট জীবন জ্বর, ফুসকুড়ি আর অস্বস্তির সঙ্গে যুদ্ধ করছে। বাইরে অপেক্ষায় মা-বাবারা। কারও চোখে নির্ঘুম রাতের ক্লান্তি, কারও ঠোঁটে দোয়া।

মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে—হামের উপসর্গ নিয়ে পাঁচ শিশু ভর্তি। কিন্তু প্রশ্নটা এখনো ঝুলে আছে—এ কি সত্যিই হাম, নাকি আরও বড় কিছুর আগাম সংকেত? হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান বললেন, “শিশুগুলোকে আইসোলেশনে রাখা হয়েছে। চিকিৎসা চলছে। পাঁচ সদস্যের একটি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে।” তার কণ্ঠে সতর্কতা আছে, তবে আতঙ্ক নেই। যেন তিনি জানেন—এই লড়াই শুধু চিকিৎসার নয়, জনআস্থারও। একদিকে প্রস্তুতি—রোগীর চাপ বাড়লে সামাল দেওয়ার পরিকল্পনা। অন্যদিকে অনিশ্চয়তা—নমুনা ঢাকায় পাঠানো হয়েছে, রিপোর্ট এখনো আসেনি। সত্যটা যেন কাগজে লেখা হওয়ার অপেক্ষায়।

Manual1 Ad Code

ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. ফিরোজের ভাষায়, “১৯ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে, এখনো কারো হাম শনাক্ত হয়নি।” এই তথ্য একধরনের স্বস্তি দেয়, কিন্তু করিডোরের উদ্বেগ পুরোপুরি কাটায় না। কারণ, অভিজ্ঞরা জানেন—রোগের চেয়ে গুজব দ্রুত ছড়ায়।
গত সপ্তাহ থেকেই এই গল্পের শুরু। একে একে আসতে থাকে শিশুরা—লালমনিরহাটের আট মাসের আমাতুল্লাহ জান্নাত, দিনাজপুরের সাত মাসের প্রজ্ঞা রায়, গাইবান্ধার দুই বছরের আরাফাত, আর রংপুর নগরীর নয় মাসের সাইয়েম। তাদের নাম আলাদা, ঠিকানা আলাদা—কিন্তু উপসর্গ একই। যেন ভিন্ন ভিন্ন গ্রাম থেকে আসা পাঁচটি নদী এসে মিশেছে এক অজানা স্রোতে।

Manual7 Ad Code

চিকিৎসকেরা বলছেন—আতঙ্ক নয়, সচেতনতা জরুরি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সাধারণ মানুষের কাছে ‘হাম’ শব্দটি এখনও ভয়ের আরেক নাম। কারণ এই রোগ শুধু শরীরে নয়, স্মৃতিতেও দাগ ফেলে। এখানেই তৈরি হয় বৈপরীত্য—সরকারি তথ্য বলছে,”কেউ আক্রান্ত নয়।” হাসপাতালের বিছানা বলছে, “ঝুঁকি আছে।”
সত্যটা মাঝখানে দাঁড়িয়ে—অদৃশ্য, কিন্তু ভারী।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি নৈতিক—আমরা কি প্রস্তুত? শুধু হাসপাতাল নয়, পুরো সমাজ কি প্রস্তুত এমন সংক্রমণের মুখোমুখি হতে? আইসোলেশন ওয়ার্ডের দরজার ওপাশে চিকিৎসা চলছে, আর এপাশে অপেক্ষা।

Manual1 Ad Code

এই অপেক্ষাই যেন সবচেয়ে দীর্ঘ। দুপুরের আলো ধীরে ধীরে বিকেলে গড়ায়। করিডোরে ভিড় কমে না।
কারণ, এখানে সময় ঘড়ির কাঁটায় নয়—মাপা হচ্ছে রিপোর্ট আসার অপেক্ষায়, আর সুস্থ হয়ে ওঠার আশায়।
শুরুটা ছিল পাঁচ শিশুকে ঘিরে। শেষটাও যেন হয় তাদের দিয়েই—কারণ, এই পাঁচটি ছোট্ট জীবনই এখন বড় এক প্রশ্নের প্রতীক: রোগটা কি আসছে, নাকি আমরা দেরি করে ফেলছি বুঝতে?