৯ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৬শে চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ২১শে শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি

ডিমলায় বুড়ি তিস্তা নদী খননের প্রতিবাদে মশাল মিছিল

admin
প্রকাশিত ডিসেম্বর ৭, ২০২৫
ডিমলায় বুড়ি তিস্তা নদী খননের প্রতিবাদে মশাল মিছিল

Manual4 Ad Code

বিশেষ প্রতিনিধি

Manual8 Ad Code

নীলফামারীর ডিমলা—শীত নামতে না নামতেই গ্রামজুড়ে জমে ওঠা উত্তেজনার তাপ যেন নদীর বুক ছাপিয়ে উঠেছে। বুড়ি তিস্তা ব্যারাজের উজানে মূল স্রোতধারা খননের প্রস্তুতি নিতে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) গত কয়েকদিন ধরেই ভারী যন্ত্রপাতি এনে রাখছে কুটিরডাঙ্গা এলাকায়। সেই যন্ত্রের লোহার চোয়াল দেখেই কুড়িডাঙ্গা থেকে শুরু করে ডিমলা, ডোমার, জলঢাকার পাঁচটি মৌজার মানুষের চোখে এক ধরনের আতঙ্ক জমে ওঠে—যেন সেই লোহার দাঁতই তাদের ঘরের দেয়াল, শানকড়া উঠোন, নিয়ত চাষের জমি গিলে খাবে।

Manual6 Ad Code

শুক্রবার (৫ ডিসেম্বর) সন্ধ্যা পেরোতেই নদীর পাড়ে অন্ধকার ভেদ করে জ্বলে ওঠে একের পর এক মশাল। তিন উপজেলার পাঁচ গ্রামের প্রায় তিন হাজার মানুষ—বৃদ্ধ, নারী, কিশোর থেকে শ্রমজীবী কৃষক—সবাই মশাল হাতে জড়ো হন বুড়ি তিস্তা ব্যারাজের উজানে। মশালগুলো একসময় নদীর ঘোলাটে জলে প্রতিফলিত হয়ে এমন দৃশ্য তৈরি করে, যেন নদী নিজেই লাল আগুনের রেখা তুলে ধরছে—হুঁশিয়ারি, প্রতিবাদ আর অদৃশ্য এক কান্নার মতো।

মিছিল এগোতে থাকে ধীর কিন্তু দৃঢ় পদক্ষেপে। মশালের আগুনে মানুষের মুখগুলো স্পষ্ট—অনেকের চোখে ক্ষোভ, অনেকের চোখে অনিশ্চয়তার চাপা ভয়। তারা হাঁটছেন নিজের ঘর, ফসলের মাঠ, বংশপরম্পরায় পাওয়া জমি বাঁচানোর তাগিদে। যেন কোনো এক অদৃশ্য শক্তি তাদের পেছন থেকে ঠেলে তুলছে, আর সামনে নদী দাঁড়িয়ে আছে প্রশ্নপত্রের মতো—নদী খনন কি উন্নয়ন, নাকি আরেক বাস্তুচ্যুতির সূচনা?

Manual1 Ad Code

সংক্ষিপ্ত সমাবেশে বক্তব্য দেন মো. আলিম ও জাহিদুল ইসলাম জাদু। তাদের কণ্ঠে ক্ষোভের পাশাপাশি ছিল বেদনা—’বুড়ি তিস্তা খনন হলে আমাদের বসতভিটা, ফসলি জমি আর জীবিকা সব হারিয়ে যাবে,’ বলেন মো. আলিম। ‘আমরা উন্নয়নবিরোধী নই, কিন্তু ভুয়া কাগজ দেখিয়ে পাউবো আমাদের ১ হাজার ২ শত ১৭ একর জমি অধিগ্রহণ করেছে—এটাই আমাদের শ্বাসরোধ করে দিচ্ছে।’

জাহিদুল ইসলাম জাদু যোগ করেন, ‘এই মশাল মিছিল সরকারের কাছে শেষ আকুতি—আমাদের অস্তিত্ব, আমাদের ঘরবাড়ি, আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ বাঁচান। বুড়ি তিস্তা খনন প্রকল্প অবিলম্বে বাতিল করতে হবে।’ তাদের বক্তব্যের সঙ্গে মুহূর্তেই মিশে যায় জনতার হুঙ্কার। হাজারো মানুষের স্লোগানে রাতের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে—আগুনের তাপে নয়, সম্ভাব্য উচ্ছেদের আতঙ্কে।

এদিকে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠতে থাকায় স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। মাঠে-ময়দানে দেখা যাচ্ছে অতিরিক্ত পুলিশ টহল। প্রশাসন আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু না বললেও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে গ্রামজুড়ে—আজ মশাল মিছিল, কাল কি সংঘাত?

পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে অভিযোগ—ভুয়া কাগজপত্রে জমি অধিগ্রহণ—সম্পর্কে জানতে বারবার সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যোগাযোগ করা হলেও এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। নীরবতা যেন আরও প্রশ্নচিহ্ন যুক্ত করছে—এ প্রকল্পের নথি, জমির মালিকানা ও অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া কি সত্যিই স্বচ্ছ?

বুড়ি তিস্তার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো জানেন, নদী তাদের জীবন; কিন্তু তারা আরও জানেন, ভুল সিদ্ধান্ত নদীর মতোই একদিন দিক পরিবর্তন করে দিতে পারে পুরো জনপদকে। তারা তাই আবারও আলো জ্বালিয়েছে—মশালের, প্রতিবাদের এবং বাঁচার অধিকারের আলো।

রাত গভীর হলেও আগুনের লাল রং তখনও আকাশে ছড়িয়ে ছিল। যেন প্রতিবাদের এই আলোই শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল—উন্নয়নের নাম ভাঙতে আসা এই ঢেউ, কে থামাবে? আর মানুষের ঘরবাড়ি, ফসল, জীবন—তার মূল্য কি ঠিকভাবে হিসাব করা হবে? সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও অমীমাংসিত। বুড়ি তিস্তায় উত্তেজনার ঢেউ তাই থেমে নেই।

Manual6 Ad Code