বিশেষ প্রতিনিধি।
চট্টগ্রাম-কক্সবাজারে মার্কিন-বাংলাদেশ যৌথ সেনা মহড়া, ইমিগ্রেশন ছাড়া মার্কিন সেনাদের বাংলাদেশে প্রবেশ, বিমান ঘাটিতে গোপন সভা ইত্যাদির মাধ্যমে দেশের সার্বভৌমত্বকে হুমকির মুখে ঠেলে দেওয়া এবং গাজায় ইসরাইলি হামলা স্হল অভিযানের মাধ্যমে জাতিগত নিধনের প্রতিবাদে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ এর উদ্যোগে আজ ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ সকাল ১০:৩০টায় ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল অনুষ্ঠিত হয়।
বাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক কমরেড বজলুর রশীদ ফিরোজের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশে আরও বক্তৃতা করেন কেন্দ্রীয় কমিটির সহকারী সাধারণ সম্পাদক কমরেড রাজেকুজ্জামান রতন, সম্পাদক মন্ডলীর সদস্য কমরেড নিখিল দাস ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কমরেড প্রকৌশলী শম্পা বসু।
সমাবেশে কমরেড ফিরোজ বলেন, গত ১০ সেপ্টেম্বর মাকিন সেনা ও বিমান বাহিনীর ১২০ জন সদস্য ইউএস বিমান বাহিনীর নিজস্ব ১৩০ জি সুপার হারকিউলিস বিমানে বাংলাদেশে আসে এবং ১৪ সেপ্টেম্বর ইউএস বাংলা বিমানে কক্সবাজার যায়। তাদের কারো ইমিগ্রেশন বা পাসপোর্ট পরীক্ষা করা হয়নি। যা দেশের প্রচলিত আইনের পরিপন্থী এবং সার্বভৌমত্বের জন্য মারাত্মক হুমকী।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ থেকে ময়ানমারে করিডোর প্রদান, তুরষ্ককে সমরাস্ত্র কারখানার অনুমোদন দেওয়া, ষ্টার লিংকের কাছে বাংলাদেশের আকাশ ইজারা দেয়া এবং আমেরিকার বার্তা এক্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী মায়ানমারের আরাকান রাজ্য, বাংলাদেশের বান্দরবান, ভারতের মিজোরাম-নাগাল্যান্ড নিয়ে মার্কিনীদের নতুন রাষ্ট্র গঠনের পরিকল্পনার কথা যখন বহুল আলোচিত হচ্ছিল তখন মার্কিন সেনাদের এহেন তৎপরতা বাংলাদেশ ও ভূ-রাজনীতির জন্য গভীর উদ্বেগ ও উৎকন্ঠার বিষয়।
তিনি বলেন, শুধু তাই নয়, গভীর রাতে কক্সবাজার বিমান ঘাটিতে এক গোপন বৈঠকে তারা মিলিত হয় এবং রাতে বিমান ঘাটি পরিদর্শন ও পরীক্ষা নিরীক্ষা করে। কক্সবাজারে রেডিসন ব্লু নামে যে হোটেলে তারা অবস্থান করে সেখানে আগে থেকেই ৮৫টি কক্ষ বুকিং দিয়ে রাখা হয় অথচ মার্কিন সেনাদের কারো নাম হোটেলের রেজিস্টারে এন্ট্রি করা হয়নি।
কমরেড ফিরোজ বলেন, এ ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটছে যখন বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শুল্ক বাণিজ্য নিয়ে টানাপোড়ন চলছে। এবং গত ৩১ আগস্ট ঢাকার হোটেল ওয়েস্টিন এ মার্কিন সেনার মৃতদেহ পাওয়া গেছে, যিনি বাংলাদেশের সেনাদের প্রশিক্ষণের দায়িত্বে ছিলেন। তাছাড়া এই মহড়া দেশের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি-ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। যদিও ইতিপূর্বে আরও দুইটি যৌথ মহড়া ‘অপারেশন প্যাসিফিক এঞ্জেল’ ও ‘টাইগার লাইটিং’ নামে পরিচালিত হয়েছে।
যার উদ্দেশ্য বলা হয়েছে উভয় দেশের সশস্ত্র বাহিনীর আন্তঃ সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। মার্কিন এই সেনা টিম ২০ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ছেড়ে যাওয়া কথা রয়েছে। সব থেকে উদ্বেগের ব্যাপার হলো বাংলাদেশের সেনা সদর দপ্তর আইএসপিআর এর পক্ষ থেকে এ বিষয়ে পূর্ব থেকে কোন বক্তব্য দেওয়া হয়নি।
যদিও গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর আইএসপিআরের পক্ষ থেকে এবং মার্কিন দূতাবাসের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে যে বিবৃতি দেয়া হয়েছে তাতে বেশ কিছু বিষয়ে তথ্যগত অমিল রয়েছে। সমাবেশে নেতৃবৃন্দ বলেন, অপারেশন প্যাসিফিক এঞ্জেল ২৫-৩” নামের যৌথ মহড়ার আওতায় বাংলাদেশে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি অনুমোদন দিয়ে বর্তমান অন্তরবর্তী সরকার তার এখতিয়ারের বাইরে সিদ্ধান্ত নিয়ে সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থ রক্ষা করেছে।
এটি বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব এবং নিরাপত্তার পরিপন্থী ও মারাত্মক হুমকি সরুপ। চট্টগ্রামের মতো স্পর্শকাতর ভৌগোলিক অঞ্চলে, গভীর সমুদ্রে মার্কিন বাহিনী বহু আগে থেকেই সামরিক ঘাঁটি করার জন্য লোলুপ দৃষ্টি ফেলে রেখেছে। উপরন্তু মায়ানমার সীমান্ত এবং রোহিঙ্গা ইস্যুতে সমস্যা বিদ্যমান। সেইসঙ্গে এখানে দেশের তিন বাহিনীর অনেক গোপনীয় এবং স্পর্শকাতর স্থাপনা রয়েছে। তাই এরকম একটি এলাকায় মার্কিনের এই সামরিক উপস্থিতি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।
একই সাথে এই মহড়ার মধ্য দিয়ে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ তার ইন্দো-প্যাসিফিক সামরিক কৌশলের সাথে বাংলাদেশকে জড়িয়ে ফেলতে তৎপর রয়েছে। নেতৃবৃন্দ বলেন, মধ্যপ্রাচ্য, লাতিন আমেরিকাসহ পুরো দুনিয়ার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা প্রমাণ করেছে জনগণের ট্যাক্সের টাকা ব্যয় করে এধরনের যৌথ সামরিক মহড়ার পেছনে সাম্রাজ্যবাদের বিরাট ভূরাজনৈতিক দুরভিসন্ধি লুকিয়ে থাকে, যা সংশ্লিষ্ট দেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বকে ধ্বংস করে।
নেতৃবৃন্দ সরকারের এহেন ভূমিকার তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়ে দেশবাসীকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের অপতৎপরতা সম্পর্কে হুঁশিয়ার থাকার আহবান জানিয়ে অবিলম্বে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের এসব তৎপরতা বন্ধের দাবি জানিয়েছেন। নেতৃবৃন্দ ফিলিস্তিনের গাজায় মার্কিন মদদে জায়নবাদী ইসরাইলী আগ্রাসন গণহতা ও দখলদারিত্বের এবং জাতিগত নিধন প্রক্রিয়ার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে অবিলম্বে গণহত্যা বন্ধ করার দাবী জানান।
একই সাথে প্যালেষ্টাইনের আবাসভূমি ফিলিস্তিনীদের ফিরিয়ে দেওয়ার জোর দাবী জানান এবং বিশ্ব বিবেককে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান।নেতৃবৃন্দ হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন , সাম্রাজ্যবাদের এ ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধ না করলে এর বিরুদ্ধে দূর্বার আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। সমাবেশ শেষে একটি বিক্ষোভ মিছিল নগরীর বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে তোপখানা রোডস্থ দলীয় কার্যালয়ে এসে শেষ।