বিশেষ প্রতিনিধি,
শেখ আসাদুজ্জামান আহমেদ টিটু।
আপনি বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী। আপনি নিজের শ্রম ও মেধার সাহায্যে বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে ১৯৭১ সালে নেতৃত্ব দিয়ে স্বাধীন করেছেন আমাদের প্রিয় স্বদেশ। আজ ২৩ জুলাই আপনার জন্মের ১০০তম বছর। ১৯২৫ সালের এই দিনে আপনি গাজীপুরের কাপাসিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি আপনার মতো মহান জাতীয় নেতাকে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন আপনি ছিলেন আমাদের জাতীয় ঐক্যের প্রতীক, আমাদের পথপ্রদর্শক। মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পর ১৯৭১ সালের ২২ ডিসেম্বর আপনি অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামসহ বাংলাদেশ সরকারের নেতৃবৃন্দ ঢাকায় প্রত্যাবর্তন করেন। শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ফিরে আসলে আপনি প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ান। দায়িত্বভার গ্রহন করেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী হিসেবে। পরবর্তীতে ১৯৭৩ এ ঢাকা-২২ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন৷ বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় বাজেট পেশ করেন, প্রণয়ন করেন প্রথম পাঁচশালা পরিকল্পনা। ক্রমেই নতুন দেশে নেতা কর্মীদের সাথে দলের, আর জনগণের সাথে সরকারের দূরত্ব বাড়তে থাকে৷ ১৯৭৪ সালে আওয়ামী লীগের দ্বিবার্ষিক কাউন্সিলের সমাপনী অধিবেশনের বক্তৃতায় আপনি দল, সরকার এবং নেতা ও কর্মীদের মাঝে দূরত্ব দূর করে, সংগঠন এবং সরকারের মাঝে এক নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তুলতে ভবিষ্যত্ নেতৃত্বের প্রতি আহ্বান জানান৷ এদিকে সুবিধাভোগী, দূর্নীতিপরায়ণ, চাটুকার রাজনীতি সংশ্লিষ্টদের নির্লজ্জ তৎপরতা বেড়েই চলে৷ শেখ মুজিবের সাথে আপনার দূরত্ব বাড়তে থাকে৷ আপনাদের মাঝে নীতিগত বিরোধ দেখা দেয়৷ আপনাদের সুন্দর সম্পর্কে ফাটল ধরে৷ তাজউদ্দিন আহমেদ আপনি নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিশ্বাস করতেন৷ আপনি ছিলেন মনে প্রাণে দেশপ্রেমিক৷ চাইতেন না কোনোদিনই আপনাকে জড়িয়ে এমন কোনো বিতর্কের সৃষ্টি হোক যা থেকে জাতির বৃহত্তর স্বার্থের কোনো ক্ষতি হয়৷ তাই ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের পর বঙ্গবন্ধু যখন সমাজতন্ত্র তথা একদলীয় বাকশাল গঠন করতে শুরু করে তখন গনতন্ত্রকামী আপনি বাংলাদেশ সরকারের অর্থমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন। এভাবেই একাত্তরের রক্ষক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের সফল নেতা হয়েও মন্ত্রীসভা থেকে আপনি বিদায় নিলেন স্বাধীনতা লাভের মাত্র ২ বছর ১০ মাসের মাথায়৷ পদত্যাগ করার পূর্বে আপনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের কাছে একটি চিঠি লিখেন, সেখানে আপনি বলেন – “যে দেশের মানুষ গনতন্ত্রের জন্য চিরকাল সংগ্রাম করেছে সে দেশের মানুষ শাসনকার্য পরিচালনার সুবিধার্থে রাজনীতির এই পরিবর্তন কখনও মেনে নিবে না।” আপনার এই পদত্যাগের মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি একজন মানুষ কতটুকু সৎ, মেধাবী, র্নিলোভ হলে ক্ষমতা পাওয়ার পরও তা আটকে না ধরে, অপব্যবহার না করে ক্ষমতা থেকে দূরে সরে থাকতে পারেন! জনাব তাজউদ্দিন আহমেদ আপনি সাধারণ মানুষের জন্য রাজনীতি করেছেন, নিজের জন্য কিছুই করেন নি অথচ আমাদের দেশের এখনকার রাজনীতিবিদদের দেখুন, হাতে গোনা মুষ্টিমেয় কয়েকজন ছাড়া বাকি সবাই কোটি টাকার গাড়ি করে সংসদে আসে, কোটি টাকার ব্যবসা বানিজ্য তাদের। তাদের মধ্যে কয়েকজন আছে খুনি, আছে কলোবাজারি। বড় বেমানান ছিলেন আপনি! আমাদের মধ্যে অনেকেই বঙ্গবন্ধুর সমালোচনা করে, ৭২’ থেকে ৭৫’ এর বঙ্গবন্ধু সরকারের সমালোচনা করে, তারা কিন্তু কেউ আপনার সমালোচনা করার সাহস পায় না। কারণ, আপনি ছিলেন স্রোতের বিপরীতের একজন! জনাব তাজউদ্দিন সাহেব, যে স্বপ্ন নিয়ে আপনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে জড়িয়েছেন, বাংলাদেশের জন্য সংগ্রাম করেছেন, যুদ্ধ পরিচালনা করেছেন, জানিনা আপনার সেই স্বপ্ন পূরণ হবে কিনা? জানিনা যে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্য আপনি ৫২’ থেকে ৭০’ পর্যন্ত চারবার কারাবরণ করেছিলেন সত্যিকারের আমরা সেই দেশ পাবো কিনা? তবে জনাব তাজউদ্দিন আপনাকে বলতে চাই আপনার স্বপ্নের ও পরিশ্রমের বাংলাদেশ আমরা তখনই পাবো যখন দেখবো আজকের অস্থির বাংলাদেশ সবকিছুকে মোকাবিলা করে ফিরে যাবে তার সোনালি অতীতে!! মৃত্যু দিয়ে জন্মের ঋণ শোধ করেছেন আপনি। শ্রদ্ধাঞ্জলি।