সামনে কঠিন সময়ের সতর্কবার্তা: বিএনপি মহাসচিব
লোকমান ফারুকঃ ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার রায়পুর ইউনিয়নের নেহা নদীর পাড়ে সকালটা ছিল ধুলোমাখা, মাটির গন্ধে ভরা। খননযন্ত্রের শব্দের ফাঁকে ফাঁকে জমছিল মানুষ। নদী খননের উদ্বোধন—কাগজে একটি উন্নয়ন কর্মসূচি, মাঠে তা হয়ে উঠল সময়ের এক সংক্ষিপ্ত ভাষ্য। সেখানেই দাঁড়িয়ে এলজিআরডি মন্ত্রী ও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বললেন, সামনে সময় ভালো নয়। “যুদ্ধটা আমাদের খুব ক্ষতি করছে,”—তার কণ্ঠে ছিল সতর্কতার স্বর, আতঙ্কের নয়। তিনি ইঙ্গিত করলেন জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার দিকে। বললেন, তেলের দাম বাড়বে, তার ঢেউ গিয়ে লাগবে বাজারে—চালের হাঁড়িতে, নিত্যপণ্যের তাকেও। একটি বাক্যে যেন অর্থনীতির দীর্ঘ সমীকরণ: “সেগুলো সয়ে নিয়ে আমাদের আগাতে হবে।
গ্রামের মানুষের কাছে এই কথাগুলো নতুন নয়। তারা আগেও শুনেছে—ঝড়ের আগে আকাশ যেমন অস্বাভাবিক শান্ত থাকে, তেমন সতর্কবার্তা। তবু বাস্তবতা হচ্ছে, এই সতর্কবার্তার ভেতরে লুকিয়ে থাকে দৈনন্দিন হিসাব—এক লিটার তেল, এক কেজি চাল, আর দিনের শেষে বাঁচার খরচ।
মন্ত্রী রাজনৈতিক প্রসঙ্গেও সরাসরি কথা বলেন। ধর্মকে ব্যবহার নিয়ে তার মন্তব্য ছিল তীক্ষ্ণ। “ধর্মকে ব্যবহার করা যায় না’—বলতে গিয়ে তিনি ইঙ্গিত করেন সেইসব রাজনীতির দিকে, যেখানে প্রতিশ্রুতি কখনো কখনো আকাশছোঁয়া, কিন্তু মাটি ছোঁয় না। তিনি বলেন, দেশের অধিকাংশ মানুষ ধর্মবিশ্বাসী, কিন্তু ধর্মের নামে ব্যবসা তারা পছন্দ করে না। “আমরা কাজ করে বেহেশতে যাব—এই বাক্যে ছিল একধরনের প্রতিরোধ, আবার রাজনৈতিক বার্তাও।
তবে বক্তব্যের আরেকটি দিক ছিল প্রশাসনিক। তেল সংকটের প্রসঙ্গে তিনি সতর্ক করেন, কোনো অস্থিরতা বা সহিংসতা সহ্য করা হবে না। “পাম্প ভাঙচুর সমীচিন নয়—এই কথার পরেই আসে কঠোরতার ইঙ্গিত: আইন নিজের পথে চলবে, ‘মব’ রাজনীতির জায়গা নেই।
কৃষির প্রসঙ্গে এসে কথার সুর কিছুটা নরম হয়। মাঠের বাস্তবতা তিনি স্বীকার করেন—ঝড়বৃষ্টিতে পড়ে যাওয়া গম, মাটিতে লুটিয়ে থাকা আলু। “আমাদের কৃষকের নিয়তি এটাই—এই স্বীকারোক্তি একদিকে সহমর্মিতা, অন্যদিকে এক দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার নীরব স্বীকৃতি।
তিনি দাবি করেন, নির্বাচনের আগে দেওয়া কৃষিঋণ মওকুফের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। আর তার সঙ্গে যুক্ত হয় ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রকল্পের কথা, যা বিস্তৃত সামাজিক সুরক্ষার ইঙ্গিত দেয়। একই মঞ্চে উন্নয়ন পরিকল্পনার কথাও আসে—সারাদেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন। কাগজে এটি একটি পরিসংখ্যান, মাঠে এটি হতে পারে পানির প্রবাহ, অথবা নতুন কোনো প্রতিশ্রুতির রেখাচিত্র। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, জেলা প্রশাসক ইশরাত ফারজানা, পুলিশ সুপার বেলাল হোসেনসহ স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা। রাজনৈতিক কর্মীরাও ছিলেন, যেমন থাকে—দূরে দাঁড়িয়ে, কাছে এসে শোনে, আবার ভিড়ে মিশে যায়।
দিন শেষে নদীর পাড়ে কাজ চলতে থাকে। মাটি কাটা হয়, নদী গভীর হয়—কিন্তু প্রশ্নগুলো রয়ে যায় ভেসে।
যুদ্ধের অভিঘাত কি শুধু দামের তালিকায় থেমে থাকবে, নাকি মানুষের সহনশীলতার সীমারও পরীক্ষা নেবে?
উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি আর বাস্তব জীবনের ব্যবধান—এই খাল কি সেটাও ভরাট করতে পারবে?