
লোকমান ফারুক, রংপুরঃ ভোরের অন্ধকার তখনো পুরো কাটেনি। হারাগাছের আকাশে কুয়াশা ঝুলছিল পাতলা পর্দার মতো। ঠিক সেই সময় ফেসবুকে একটি দীর্ঘ স্ট্যাটাস দেন রংপুর-৪ আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য ও এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন। শেষ লাইনটি ছিল সরল, কিন্তু ভারী—"আমার হারাগাছে আসা নিয়ে যদি কিছু ঘটে তার দায় ভরসা এবং বিএনপির হাইকমান্ডকে নিতে হবে।"
একটি সফর। একটি হরতালের ডাক। আর তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে নির্বাচনের পরবর্তী উত্তেজনা—যেন আগুন নেভার পরও ছাইয়ের নিচে দপদপে অঙ্গার।
সফর, বিক্ষোভ ও আশঙ্কা। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নিজ নির্বাচনী এলাকায় প্রথমবারের মতো আসছেন আখতার হোসেন। তার সফর ঘিরে হারাগাছে বিক্ষোভ কর্মসূচির ঘোষণা দেয় পৌর বিএনপি। স্থানীয়দের আশঙ্কা—আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতি হতে পারে।
স্ট্যাটাসে আখতার হোসেন অভিযোগ করেন, বিএনপি সরকার গঠনের আভাস পাওয়ার পর থেকে তার সমর্থকদের বাড়িঘর ভাঙচুর, হামলা ও লুটপাট করা হচ্ছে। তিনি লেখেন, "সরকার গঠন করেছে বিএনপি, আর নতুন সরকারের আমলে প্রথম হরতাল হচ্ছে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে।" তার ভাষায়, "এনারা আসলে বিএনপি করেন না, ভরসা করেন।
এই ‘ভরসা’ বলতে তিনি বুঝিয়েছেন রংপুর-৪ আসনে তার প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি প্রার্থী এমদাদুল হক ভরসা-কে।
১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনটি নিয়েও বিস্তর অভিযোগ তুলেছেন আখতার হোসেন। তার দাবি, হারাগাছ পৌরসভার বিভিন্ন কেন্দ্রে তার সমর্থকদের ব্যাজ পরতে দেওয়া হয়নি। কয়েকটি কেন্দ্রে কর্মীদের মারধর, ভোটার স্লিপ টেবিল ভাঙচুর ও হুমকির ঘটনা ঘটেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তিনি লিখেছেন, হারাগাছ মডেল কলেজ কেন্দ্রে কাস্টিং ভোটের হিসাব নিয়ে বের হতে গেলে শত শত লোক গেট আটকে দেয়। ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। পরে সেনাবাহিনী এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
এক পর্যায়ে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী এমদাদুল হক ভরসা সেখানে উপস্থিত হন বলেও উল্লেখ করেন আখতার। তার ভাষ্য, পরবর্তী একটি কেন্দ্রে তারা একসঙ্গে প্রবেশ করে কাস্টিং ভোটের হিসাব নেন। তবে ভরসার গাড়ির গ্লাস ভাঙা নিয়ে পরস্পরবিরোধী অভিযোগ উঠে। আখতার দাবি করেন, তাকে ফাঁসানোর চেষ্টা হয়েছিল; ভরসা পক্ষ তা অস্বীকার করে।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে রংপুর-৪ (পীরগাছা ও কাউনিয়া) আসনে আখতার হোসেন শাপলা প্রতীকে ১ লাখ ৪৯ হাজার ৯৬৬ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী এমদাদুল হক ভরসা পান ১ লাখ ৪০ হাজার ৫৬৪ ভোট। ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে ভোট পুনর্গণনার দাবি জানান ভরসা। রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দেন তিনি। এরপর কয়েকদিন ধরে হারাগাছ, পীরগাছা ও কাউনিয়ায় বিক্ষোভ, সমাবেশ ও সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালিত হয়। জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ঘেরাও করে পুনর্গণনা না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন তার সমর্থকরা।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে এমদাদুল হক ভরসা বলেন, তিনি বর্তমানে অসুস্থতার কারণে ঢাকায় চিকিৎসাধীন। হারাগাছে তার নামে কোনো কর্মসূচি নেই। তার দাবি, "আমার নাম ব্যবহার করে যে বক্তব্য প্রচার করা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।" তিনি আরও বলেন, "রংপুর-৪-এর মানুষ ভোট ও মাঠের বাস্তবতা দেখেছে। আমাদের ওপর যে অন্যায় হয়েছে, সে বিষয়ে আমি আইনগতভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি।"
আখতার হোসেন তার স্ট্যাটাসে আরও দাবি করেন, গত দেড় বছরে হারাগাছ পৌরসভার জন্য তিন দফায় সাড়ে ৬ কোটি টাকা বিশেষ বরাদ্দ এনেছেন। সেই বরাদ্দের কাজ পরিদর্শন ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়াতে তিনি হারাগাছে যাচ্ছেন বলে জানান।
তার বক্তব্য, "হারাগাছের ৫৫ হাজার ভোটের মধ্যে আমি পেয়েছি ৫ হাজার। কিন্তু প্রতিটি ভোট আমার কাছে হাজার ভোটের সমান।
স্থানীয়রা বলছেন, নির্বাচনের পর থেকে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা অব্যাহত। প্রশাসনের দৃশ্যমান হস্তক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগ আছে, পাল্টা অভিযোগও আছে। প্রমাণের ভার এখন তদন্তের টেবিলে। গণতন্ত্রে পরাজয় যেমন বাস্তব, তেমনি অভিযোগও বাস্তবতার অংশ। কিন্তু অভিযোগ যদি রাস্তায় নামে, আর রাজনীতি যদি হরতালের ভাষা নেয়—তখন ভোটের মর্যাদা কোথায় দাঁড়ায়?
একজন এমপি নিজের নিরাপত্তা নিয়ে প্রকাশ্যে দায় চাপান প্রতিপক্ষের ওপর। আর প্রতিপক্ষ বলেন, সবই মিথ্যা প্রচার। এই দ্বন্দ্বের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষ—যাদের ভোটেই সংসদ গঠিত হয়—তাদের নিরাপত্তা, তাদের আস্থা, তাদের সত্য কে রক্ষা করবে?
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক -শেখ তিতুমীর আকাশ।
বার্তা প্রধান : মোঃ সেলিম উদ্দিন
ইমেইল: dailyswadhinbhasha@gmail.com
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি। সকল স্বত্ব www.abhijug.com কর্তৃক সংরক্ষিত।