
লোকমান ফারুক, রংপুরঃ ভোরের কুয়াশা কাটার আগেই ট্রলিভর্তি আলু এসে থামে সুন্দরগঞ্জ বাজারে। কাঁধে বস্তা তোলা কৃষকদের চোখে ঘুম নেই, আছে তাড়া। কারণ তারা জানেন দাম আজ যা, কাল তা নাও থাকতে পারে। সংরক্ষণের উপায় নেই। সময়ই এখানে সবচেয়ে বড় পাইকার।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলা তিস্তা নদীবেষ্টিত এই জনপদে জমি উর্বর, ফলন ভালো। আলু, পেঁয়াজ, মরিচ, শাকসবজি মৌসুমে মাঠ যেন রঙের মেলা। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে এখানকার উৎপাদিত পণ্য দেশের বিভিন্ন জেলায় যায়। কিন্তু ফসল কাটার সময় শুরু হয় অদৃশ্য চাপ। সরকারি কোনো হিমাগার নেই। স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও স্থাপিত হয়নি একটি কোল্ড স্টোরেজ। বেলকা ইউনিয়নের কৃষক মজিবর রহমান বলেন, "মাঠে আলুর দাম যখন ১৫–১৬ টাকা কেজি, তখনই বিক্রি করতে হয়। বাড়িতে রাখলে পচে যাবে। যদি একটা হিমাগার থাকত, এখন বিক্রি না করে পরে বিক্রি করতে পারতাম।" তার কণ্ঠে অভিযোগের চেয়ে ক্লান্তি বেশি।
কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমস্যা শুধু অবকাঠামোর নয়, বাজার কাঠামোরও। হিমাগার না থাকায় মৌসুমে বাজারে একসঙ্গে বিপুল সরবরাহ ঢুকে পড়ে। দাম পড়ে যায়। পাইকারি ব্যবসায়ীরা কমদামে কিনে অন্য জেলায় বেশি দামে বিক্রি করেন। কৃষক তখন প্রবাদ মেনে চলেন—"নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো।" কম দামে বিক্রিই তার নিরাপদ পথ। আরেকটি বাস্তবতা হলো বীজ সংরক্ষণ। স্থানীয় কৃষকদের পরবর্তী মৌসুমের জন্য অন্য জেলার হিমাগারের ওপর নির্ভর করতে হয়। এতে পরিবহন খরচ বাড়ে, ঝুঁকিও বাড়ে। কখনও বীজের মান নষ্ট হয়। খরচের বোঝা গিয়ে পড়ে কৃষকের কাঁধে।
উপজেলার প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ সরাসরি কৃষিনির্ভর। চরাঞ্চলের উর্বর জমি বছরে একাধিক ফসল দেয়। কিন্তু বাজারজাতকরণ ও সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাবে কৃষক দারিদ্র্যের বৃত্ত থেকে বের হতে পারেন না। ফলন বাড়লেও আয় বাড়ে না—এ যেন ভরা পুকুরে মাছ আছে, কিন্তু জাল নেই। স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তারা জানান, "বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার জানানো হয়েছে। বেসরকারি উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে আগ্রহী করতে উদ্যোগ চলছে। তবে কবে নাগাদ বাস্তবায়ন হবে, তার নির্দিষ্ট সময়সীমা কেউ বলতে পারেননি।"
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, একটি আধুনিক হিমাগার শুধু কৃষকের সুরক্ষা দেবে না, সরকারের রাজস্বও বাড়াবে। কর্মসংস্থান তৈরি হবে। বাজারে সারা বছর স্থিতিশীল সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এই জনপদে প্রশ্নটা সরল—উৎপাদন বাড়াতে আমরা সফল, কিন্তু সংরক্ষণে কেন পিছিয়ে? কৃষকের ঘামে ভেজা আলু যখন মাটির গন্ধ হারিয়ে পচে যায়, তখন ক্ষতি শুধু অর্থের নয়, আস্থারও।
রাষ্ট্র যদি কৃষিকে মেরুদণ্ড বলে, তবে সেই মেরুদণ্ডকে সোজা রাখার দায় কার? সুন্দরগঞ্জের মাঠে এখনো ফসল ফলছে। কিন্তু হিমাগারহীন এই বাস্তবতায় কৃষকের ধৈর্য কতদিন টিকবে—সে প্রশ্ন রয়ে গেল।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক -শেখ তিতুমীর আকাশ।
বার্তা প্রধান : মোঃ সেলিম উদ্দিন
ইমেইল: dailyswadhinbhasha@gmail.com
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি। সকল স্বত্ব www.abhijug.com কর্তৃক সংরক্ষিত।