ফয়সাল আহমেদ, রূপগঞ্জঃ এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু। এ বক্তব্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হলেও এখন বক্তব্য দেন মুজিব পাগল আউয়াল আলী। গত ৪৫ বছর ধরেই তিনি বক্তব্য দিয়ে আসছেন। বয়স তার ৭৫। তার কন্ঠের তেজ এতটুকুও কমেনি। বঙ্গবন্ধুর জন্য তিনি এতই পাগল যে, সংসার, সন্তান আর স্ত্রীর পর্যন্ত খোজ-খবর নেন না। নিজের নাওয়া-খাওয়া পর্যন্ত ভুলে যান। চায়ের দোকান, বাজারে-বন্দরে, ক্ষেতে-খামারে, ষ্টেশনে যেখানেই যান, সেখানেই শেখ মুজিবুর রহমানের বক্তব্য দেন। শোনান মুজিবুর রহমানের ইতিহাস। শুধু তাই নয়, কেউ যদি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কটুক্তি করেন, তখন তিনি চটে যান। এ সবই তিনি করছেন নিঃশ্বার্থভাবে।
বঙ্গবন্ধুর জন্য তিনি মরতেও রাজি। ৭৩’ সালে ঢাকার বাসাবোতে শেখ মুজিবুর রহমান তার বক্তব্য শুনে তাকে ওস্তাদ খেতাব দিয়েছিল। এরপর থেকেই লোকে তাকে ওস্তাদ মুজিব বলে ডাকে। ঐ সময় শেখ মুজিবুর রহমান তাকে একটি মুজিব কোট দিয়েছিলেন। দিন আনা দিন খাওয়া আওয়াল আলীর স্বপ্ন ছিল বঙ্গবন্ধুর নামে একটি এতিমখানা করা। এখনো তিনি সে স্বপ্ন নিয়ে বেচে আছেন। তার আকুতি- মেজর ডালিমকে কাছে পেলে জিজ্ঞেস করতেন, আরে বেটা তুই আমার মুজিবকে ক্যান মারলি, এর পরিবর্তে আমার জীবনটা নিতি।
তিনি আরো বলেন, ডালিমকে কাছে পাইলে ওর হাত দুইডা কাইটা ফালাইতাম। ও আমার মুজিবের জীবন নিছে এ হাত দিয়া। বঙ্গবন্ধুর দেয়া মুজিব কোট এখনো তিনি স্মৃতি হিসাবে বুকে আগলে রেখেছেন। তার বেচে থাকার অবলম্বন এখন এ মুজিব কোটটি। বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহেনা যেন দীর্ঘদিন বেচে থাকেন এবং দেশের দায়িত্ব পালন করতে পারেন তার জন্য মানুষের কাছে দোয়া চেয়ে বেড়ান।
গত ১০ আগষ্ট কায়েতপাড়া ইউনিয়নের উত্তরপাড়া এলাকায় এক চায়ের দোকানে অনেক জটলা। কৌতুহল জাগলো দেখার। এগিয়ে গিয়ে দেখি এক বৃদ্ধ বঙ্গবন্ধুর বক্তব্য শোনাচ্ছেন সবাইকে। বক্তব্য শুনে আমিও থমকে গেলাম। তিনি বজ্রকন্ঠে শেখ মুজিবুর রহমানের বক্তব্য শোনাচ্ছেন সবাইকে। তার পরণে পাজমা-পাঞ্জাবী আর মুজিব কোট। তার নাম জিজ্ঞেস করতেই লোকজন একসুরে বলে উঠলো ওস্তাদ মুজিব। স্থানীয়রা জানান, ওস্তাদের আর কোন কাজ নেই। তিনি সংসার , স্ত্রী ও ছেলেদের খোজ-খবর রাখেন না। তার কাম মানুষেরে শেখ মুজিবুরের বক্তব্য শোনানু। আর তার ইতিহাস বলা।
কেউ যদি বঙ্গবন্ধুর নামে বদমান বলে, তাহলে তার সঙ্গে আউয়াল আলী ঝগড়া লেগে যায়। প্রত্যক্ষদর্শী মোতালিব মিয়া বলেন, স্বাধীনতার সময় হেয় একটা টেনডেস্টার(রেডিও) কিনছিল। যেদিন শেখ মজিবরের মরার খবর হুনলো, লগে-লগে টেনডেস্টারটা আছাড় মাইরা ভাইঙ্গা ফালাইলো। আউয়াল আলীর বাড়ি উপজেলার কায়েতপাড়া ইউনিয়নের অজোপাড়াগায়ের খামারপাড়া গ্রামে।
নুন আনতে পান্তা ফুরায় তার। বাবার এমন কীর্তিকলাপে ছেলেরা বাড়ি ছেড়ে চলে গেছেন। একমাত্র স্ত্রী আছেন পাগল স্বামীর মুখপানে তাকিয়ে। নাওয়া-খাওয়া খবর থাকে না তার। সংসার আছে কি নেই তার হিসাব নেই। তার এক হিসাব আমার মুজিব কই? ওরা ক্যান আমার মুজিবরে মাইরা ফালাইলো। আমারে মাইরা ফালাইতো।
সরজমিনে খামারপাড়া ও আশপাশের এলাকা ঘুরে জানা যায়, বঙ্গবন্ধুর রেসকোর্স ময়দানে ঐতিহাসিক বক্তব্য শোনার পর থেকেই আউয়াল আলী বক্তব্য দেয়া শুরু করে। এরপর আর থেমে নেই। ৭৫’ সালের ১৫ আগষ্ট বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর থেকে ওস্তাদ আওয়াল আলী পুরোপুরি বঙ্গবন্ধুর ভাষণ নেশা হিসাবে বেছে নেন। চায়ের দোকান, ক্ষেতে-খামারে, ষ্টেশনে যেখানেই বসেন, সেখানেই বঙ্গবন্ধুর ভাষণ দেন। শোনান শেখ মুজিবুর রহমানের ইতিহাস। এতেই কেউ যদি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বাজে মন্তব্য করেন, তাহলে তার আর রেহাই নেই। তেলে-বেগুনে জ্বলে তিনি অগ্নিশর্মা হয়ে যান। তবে বক্তব্য বলেন আর ইতিহাসই বলেন তিনি তা দেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষকে শুনিয়েছেন। চট্রগ্রামের লালদিঘী ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ দিয়েছিলেন বলে আউয়াল আলী জানান। ধান কাটার মৌসুমে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বদলিরা( কামলা) তার এলাকায় আসলে তাদেরকে বক্তব্য ও ইতিহাস শোনান।
স্থানীয়রা জানান, সকাল হলেই তিনি গোসল সেরে জামা-কাপড় আর মুজিব কোট পড়ে বের হয়ে যান। সারাদিন ঘুরে-ফিরে রাতে বাড়িতে ফিরেন। মুজিব কোট ছাড়া যেন তার এক পা-ও চলে না। গত ৪৫ বছর ধরেই তিনি নিঃশ্বার্থভাবে এ কাজ চালিয়ে আসছেন। তবুও আউয়াল আলীর মনে যেন তৃপ্তি নেই। শেখ মুজিবুর রহমানের বিচার হলেই না-কি তিনি সুখী। তবে মৃত্যুর আগ মুহুর্ত পর্যন্ত তিনি বঙ্গবন্ধুর ভাষণের প্রচার কাজ চালিয়ে যাবেন। নতুন প্রজন্মের ছেলে-মেয়েদের কাছে বঙ্গবন্ধুর ইতিহাস তুলে ধরবেন। বাগবাড়ী এলাকার আওয়ামীলীগ নেতা কামাল আহমেদ রঞ্জু বলেন, আমি ছোট থেকে দেখে আসছি তিনি বঙ্গবন্ধুর ভাষণ দিয়ে আসছেন।
তাছাড়া ইতিহাসও শুনান মানুষকে। খিলগাও থানার বালুপাড় এলাকার আওয়ামীলীগ নেতা শহিদুল্লা মিয়া জানান, ওস্তাদ আউয়াল আলী যখন-তখন শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ দেন। ভাষণ শুনতেও খারাপ না। সবাইতো দল করে লাভের আশায়। একমাত্র তাকেই দেখলাম বিনা স্বার্থে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ও ইতিহাস মানুষের কাছে তুলে ধরতে। ওস্তাদ আউয়াল আলীর স্ত্রী হাওয়া বেগম বলেন, কি কমু বাপ। গত ৪৫ বছর ধইরা হের পাগলামির কারণে সংসারটা শেষ অইয়া গেলোগা। খাওয়ন-পিন্দনের খবর থাহে না। খালি ভাষণ আর ভাষণ লইয়া থাহে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি ছোট একটা দোহান চালাইয়া কোনমতন সংসার চালাই। ওস্তাদ আউয়াল আলীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বঙ্গবন্ধুর নাম মুখে নিতেই হাউমাউ করে কেদে ফেলেন। তিনি বলেন, আমি মুজিব ছাড়া কিছুই বুঝিনা। বঙ্গবন্ধুর ভাষন আর হের ইতিহাস কওয়াই আমার কাম। যারা দুনিয়াত নতুন আইবো হেগো আমার মজিবরের কিস্সা( গল্প) হুনামু। তিনি বলেন, আমার টেহা অইলে মজিবরের নামে একটা এতিমখানা বানামু। এহানে গরীব মাইনষের পোলাপান লেহাপড়া কইরা আমার মজিবরের লেইগ্যা দোয়া করবো। তিনি কেদে কেদে বলেন, আমারে মুজিবুর স্যারে যে মজিব কোটটা দিয়া গেছে হেইডা নিয়া আমি বাইছা আছি। ডালিমরে পাইলে আমি জিগাইতাম, বেটা তুই ইমুন সোনার মানুষটারে মারলি ক্যান? হেরে না মাইরা আমারে মাইরা ফালাইতি।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক -শেখ তিতুমীর আকাশ।
বার্তা প্রধান : মোঃ সেলিম উদ্দিন
ইমেইল: dailyswadhinbhasha@gmail.com
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি। সকল স্বত্ব www.abhijug.com কর্তৃক সংরক্ষিত।