এম আকাশ,খুলনা বিভাগীয় ব্যুরোঃ
কৃষি ও মৎস্য চাষে জীবন জীবিকা নির্বাহ করে সাতক্ষীরা জেলার কালিগঞ্জের অধিকাংশ মানুষ। এই লাভজনক ব্যবসা ধরে রাখতে উপজেলার কৃষকেরা শুরু করেছে মৎস্য চাষের পাশাপাশি ঘেরের ভেড়িতে সবজি ও সরিষা চাষ। এখন শীতের মৌসুম, শীতের শুরুতে কৃষকেরা ঘেরের ভেড়িবাঁধে সরিষা চাষ করতে শুরু করেছে। এই সরিষা ফুল এখন হলুদে হলুদময় হয়ে উঠেছে গ্রাম বাংলার প্রান্তর। হলুদ ফুলে ভরে গেছে মৎস্য ঘেরের ভেড়িবাধ। যেদিকে দেখি শুধু পানির উপরে হলুদের সমাহার। পথিকের নজর কাড়তে ফুলের সৌন্দর্য বাড়িয়েছে মৌমাছির দল। কখনো কখনো মৎস্য ঘেরের ভেড়িবাঁধে সরিষা ফুলে বসছে পোকাখাদক বুলবুলি ও শালিকের ঝাঁক। সরেজমিনে ঘেরের ভেড়িতে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলার মৌতলা, ধলবাড়িয়া, মথুরেশপুর, কুশুলিয়া, তারালী ইউনিয়নের বিভিন্ন মৎস্য ঘেরের ভেড়িবাধে চাষ করা হচ্ছে সব ধরনের রকমারি ফসল। সরিষা চাষ কিছুটা কম হলেও মৎস্য ঘেরের ভেড়িবাঁধে শোভা বাড়িছে এসব সরিষা ফুল। ঘেরের চারিদিক যেন হলুদে হলুদে পরিপূর্ণ। প্রথম দেখাতেই মন কাড়বে পথচারীদের। সরিষা ফুলের শোভা আরও বাড়িয়ে তুলেছে অসংখ্য মৌমাছির দল। গুণগুনিয়ে মধু আহরণে ব্যাস্ত তারা। সকালের এক টুকরো রৌদ্দুর সোনার চেয়েও মনে হয় দামি। ঘর ছেড়ে আমরা এদিক ওদিকে যাই এক টুকরো রৌদ্দুরের তৃষ্ণায়। কবি সুকান্ত লিখেছিলেন, পৌষের রোদমাখা মিষ্টি সকালের এমন লোভনীয় বর্ণনা। তবে আধুনিকতার ধ্বকলে ধীরে ধীরে বিলীনের তলানীতে মিশে যাচ্ছে পরিবেশ আর প্রকৃতির রূপরেখা। আর সময়ের ব্যস্তাতায় হারিয়ে যাচ্ছে শৈশবের গল্পমালার সেই সুখময় স্মৃতি। ক্রমশই যেন ভুলে যাচ্ছি মনের গহীনে সযতনে লালিত পৌষের রোদমাখা সেই দিনগুলোর কথা। যা ফিরে আর আসবে কি কখনো? পৌষে প্রকৃতিজুড়ে শুরু হয় রঙ-বেরঙের খেলা। প্রান্তরজুড়ে সরিষার মৎস্য ঘেরের ভেড়িবাধে দোল খাওয়া কাঁচা হলুদ। সরিষার সবুজ গাছের হলুদ ফুল পৌষের সোনাঝরা রোদে ঝিকমিকিয়ে উঠছে। এ যেন এক অপরূপ সৌন্দর্য। যেন প্রকৃতি কন্যা সেজে আছে “গায়ে হলুদ বরণ সাজে”। আশ্চর্য সুন্দরে আটকে যায় চোখ। পৌষে ফুলেরাও যেন বাড়তি আবেদন নিয়ে হাজির হয়। সৌন্দর্য্যরে সবটুকু মেলে ধরে। মৌসুমী ফুলে ভরে ওঠে বাগান। হলুদ গাঁদা ফুল এরই মাঝে শীতকে স্বাগত জানিয়েছে। এই যখন সরিষা মৎস্য ঘেরের ভেড়িবাধে অবস্থা তখন অন্যদিকে “পৌষ পার্বণে পিঠা খেতে বসি খুশীতে বিষম খেয়ে/ আরও উল্লাস বাড়িয়াছে মনে মায়ের বকুনি পেয়ে। বাংলাদেশের বিখ্যাত কবি বেগম সুফিয়া কামাল শীতের পিঠাকে নিয়ে এমন বর্ণনা লিখেছেন পল্লী মায়ের কোল কবিতায়। পৌষে কৃষকের ফসল ঘরে তোলার কাজ শেষ হয়ে যায়। হাতে তেমন কাজ থাকে না সবাই উৎসব-আনন্দে মাতে। নতুন ধান থেকে পাওয়া চালে ঘরে ঘরে চলে পিঠা পুলির আয়োজন। পৌষের শেষদিনে ব্যাপক আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় পৌষসংক্রান্তি। পৌষের এই পিঠা উৎসবকে কেন্দ্র করে বাড়ি বাড়ি মহাধুম পড়ে যেতো। গ্রামের প্রায় প্রতি বাড়িতে আসতো জামাই-ঝি, নতুন কুটুম আর বিয়াই-বিয়াইনসহ আত্মীয়স্বজন এবং দূরদূরান্তে অবস্থান করা পরিবারের সদস্যরা। আগের মতো গাঁও-প্রামে বাড়ি বাড়ি এখন আর পিঠা উৎসব হয় না। কালিগঞ্জ উপজেলার মৌতলা ইউনিয়নের ছামসুদ্দীন আহম্মেদ এর স্ত্রী রাবেয়া খাতুন বলেন, “শীতের পিঠা খাওয়াতে মেয়ে ও জামাইদের দাওয়াত করে এনেছি। ছেলে থাকে ঢাকা গুলসানে তাদেরও ফোন করে বাড়িতে এনেছি। বছরের একটি দিন সবাই মিলে পিঠা পায়েশ না খেলে মন ভরে না। কালিগঞ্জ উপজেলা আওয়ামীলীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি ও উপজেলা চেয়ারম্যান সাঈদ মেহেদী জানান, আমাদের দেশে পৌষ মাস মানেই বাঙালির পিঠা-পুলির উৎসব। বাঙালির শেকড়ের আদি ঐতিহ্য। শীতের পিঠার গোড়াপত্তন গ্রামে। একটা সময় শীতের পিঠার জন্য শহর থেকে গ্রামে যাওয়ার রেওয়াজ ছিল। গ্রাম-বাংলার সেই রসালো পিঠা-পায়েস আর পরিবারের সবাই মিলে সে পিঠা খাওয়ার উৎসব রীতি এখন অনেকটাই ম্লান। বাড়ির আঙিনায় মাটির চুলার ওপর মাটির হাঁড়িতে পিঠা বানানোর যে দৃশ্য, তা এখন আর সহসা চোখে পড়ে না। অন্যদিকে নদ-নদী, হাওড় ও জলাধারে ঘুরে বেড়ায় শীতের পাখিরা। প্রায় সারাদেশের বনে, রাস্থার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা গাছের শাখায় চলে পাখিদের মহোৎসব। দেশীয় পাখিদের সঙ্গে সুদূর সাইবেরিয়া থেকে যোগ দেয় অতিথি পাখিরা। গ্রামীণ পরিবেশে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে শীতকাল। দিন যায়, দিন আসে। বয়স বাড়ে, ফুরিয়ে আসে শৈশবের কত স্মৃতি। আমরা ইচ্ছে করলেও এখন পারি না শীতে ঘাসের চূড়ায় চূড়ায় ঝলমলানি শিশির বিন্দু স্পর্শ করতে। দেখা হয়না দিগস্ত বিস্তৃত সরিষা ফুলে সোনা রোদের মাখামাখি। ভোরবেলায় বাড়ির উঠোনে গাছির হাতে টাটকা খেজুর রসের আস্বাদন নেই না কতদিন! সকালে শিউলি ঝরা মাঠে অথবা শিশির ভেজা দূর্বা ঘাসের উপর খালি পায়ে ছুটে চলা হয়না বহুদিন। সময়ের ব্যস্ততা আর আধুনিকতার ধ্বকলে ধীরে ধীরে বিলীনের তলানীতে মিশে যাচ্ছে শৈশবের গল্পমালার সুখস্মৃতি। আমাদের মনের গহীনে সযতনে লালিত পৌষের রোদমাখা সেই দিনগুলোর কথা।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক -শেখ তিতুমীর আকাশ।
বার্তা প্রধান : মোঃ সেলিম উদ্দিন
ইমেইল: dailyswadhinbhasha@gmail.com
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি। সকল স্বত্ব www.abhijug.com কর্তৃক সংরক্ষিত।